মূল্যবোধ ও সুশাসন (Values & Good Governance)

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে মূল্যবোধ ও সুশাসন (Values & Good Governance) নিয়ে আলোচনা করব।

মূল্যবোধ ও সুশাসন

মূল্যবোধ ও সুশাসন (Values & Good Governance) সুশাসন এক ধরনের মূল্যবোধ। আর মূল্যবোধ হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি। মূল্যবোধ যত উন্নত হবে সমাজ ও রাষ্ট্র তত উন্নত হবে। সমাজ ও রাষ্ট্র উন্নত হওয়া বলতে সাধারণত সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে বোঝায়। যদি মূল্যবোধের অবক্ষয় কোনো সমাজে ও রাষ্ট্রে দেখা যায় তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যান্য উদ্যোগগুলোও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

সুশাসন হলো কিছু নিয়মনীতি যা সরকারি সংগঠনসমূহের আচার-আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, নাগরিকদের উদ্দীপ্ত করে, সরকারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে। অপরদিকে, মূল্যবোধও হলো কতকগুলো নীতি, আদর্শ এবং আচরণবিধি যাকে একটি সমাজের মানুষ ভালো ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

এ ধারণা থেকে দেখা যায়, মূল্যবোধ ও সুশাসন উভয়েই হচ্ছে কতকগুলো নিয়মনীতির সমষ্টিমাত্র। আবার উভয়েরই কতকগুলো উপাদান রয়েছে। এ উপাদানসমূহের মধ্যে ব্যাপক সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। সুশাসনের উপাদানসমূহ হলো জনগণের অংশগ্রহণ, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জনমত, সমতা, দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ।

অপরদিকে, মূল্যবোধের উপাদানসমূহ হলো নীতি ও ঔচিত্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলাবোধ, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, শ্রমের মর্যাদা, আইনের শাসন, নাগরিক সচেতনতা ও কর্তব্যবোধ, সরকার ও রাষ্ট্রের জনকল্যাণমুখিতা এবং দায়-দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা।

সুশাসন ও মূল্যবোধের উপাদানসমূহের সাদৃশ্য দ্বারা বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মূল্যবোধের যে সকল উপাদানগুলো ভূমিকা পালন করে সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো-

১. আইনের শাসন: আইনের শাসন হচ্ছে সুশাসন ও মূল্যবোধের অন্যতম উপাদান। আইনের শাসনের অর্থ সকলেই আইনের অধীন। শাসক-শাসিত, ধনী-গরিব সকলেই একই অপরাধের জন্য সমানভাবে শাস্তিযোগ্য। সরকারের ক্ষমতা আইন থেকে প্রাপ্ত এবং শাসকও আইনের অধীন। বিনা অপরাধে কাউকে বিচার করা যাবে না বা শাস্তি দেওয়া যাবে না।

এ জন্য আইনকে হতে হবে সর্বজনীন। সুশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আইনের শাসন এমন হবে যাতে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ আইনগুলোও হবে নাগরিকদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মূল্যবোধের উপাদানগুলো আইনের শাসন কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

২. দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা: দায়-দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা বলতে কেবল সরকারের দায়-দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা বোঝায় না। ব্যক্তিগত অবস্থানে প্রত্যেক ব্যক্তির সমাজের সকলের জন্য দায়িত্ব ও সমাজের সকলের নিকট জবাবদিহিতা রয়েছে।

এমনকি বিবেকের নিকটও তাকে জবাবদিহি করতে হয়। এর অভাবে বিশৃঙ্খল ও স্বেচ্ছাচারী সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অর্থাৎ সুশাসনের পরিবর্তে মন্দ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হলে সুশাসনের অপর উপাদান স্বচ্ছতার বিষয়টিও নিশ্চিত হয়।

৩ . নাগরিক সচেতনতা ও কর্তব্যবোধ: নাগরিক সচেতনতা ও কর্তব্যবোধ ছাড়া মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। মূল্যবোধগুলো কতকগুলো নৈতিকতা ও আদর্শ হিসেবে সমাজে গৃহীত হয়েছে। এগুলো শাস্তিযোগ্য নয়। তাই মূল্যবোধগুলোর সংরক্ষণ ও লালন নাগরিকদের সচেতনতা ও কর্তব্যবোধের ওপর নির্ভরশীল।

এককথায় বলা যায়, নাগরিকদের অংশগ্রহণের দ্বারা মূল্যবোধগুলো সংরক্ষিত হয়। আবার নাগরিকদের অংশগ্রহণ সুশাসনের অন্যতম প্রধান উপাদান। নাগরিকদের অংশগ্রহণের দ্বারা যেমন মূল্যবোধ সংরক্ষিত হবে তেমনি স্বেচ্ছাচারিতা দূরীভূত হয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। নাগরিক অংশগ্রহণ হবে তখনই যখন নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত হবে। সহজভাবে বলা যায়, কর্তব্যবোধ না থাকলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না।

৪. সামাজিক ন্যায়বিচার: সামাজিক ন্যায়বিচার বলতে বোঝায় ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাজ, আচরণ ও ন্যায়-অন্যায় বিচারের মানদণ্ড হবে এক ও অভিন্ন। মূল্যবোধের এ উপাদানটিকে আমরা সমতা হিসেবেও আখ্যায়িত করতে পারি। সুশাসনের অন্যতম একটি উপাদান হলো সমতা। সমতার উদ্দেশ্যও সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুরূপ।

সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না থাকলে সুশাসন হবে ঐ সমাজের জন্য অলীক কল্পনামাত্র। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান সুযোগও নিশ্চিত হবে যা ঐ সমাজকে সুশাসনের দিকে ধাবিত করবে। অর্থাৎ এক কথায় বলা যায়, সামাজিক ন্যায়বিচার সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান।

৫. সরকার ও রাষ্ট্রের জনকল্যাণমুখিতা: সরকার ও রাষ্ট্রের জনকল্যাণমুখিতা মূল্যবোধের একটি অন্যতম উপাদান। সরকার ও রাষ্ট্র জনকল্যাণমুখী না হলে তাকে মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সরকার নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান ও বিনোদনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে নাগরিকদের চাহিদা পূরণ করবে।

সুশাসনের দৃষ্টিতে বিষয়টিকে বলা হয় দক্ষতা। সরকার ও রাষ্ট্রের জনকল্যাণমুখিতার বিষয়টিই ঐ রাষ্ট্র ও সমাজকে সুশাসনের দিকে ধাবিত করবে। অবশ্য জনকল্যাণমুখিতা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে যদি অংশগ্রহণমূলক কার্যকর পরিকল্পনা, অপচয় ও দুর্নীতি রোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়। আর এ বিষয়গুলোই সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুশাসনের দিকে ধাবিত করে।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। মূল্যবোধ ও সুশাসন (Values & Good Governance) এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url