মূল্যবোধের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Values)

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে মূল্যবোধের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Values) নিয়ে আলোচনা করব।

মূল্যবোধের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Values)

মূল্যবোধের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Values) মূল্যবোধ হলো এক ধরনের মান বা স্ট্যান্ডার্ড, যা সমাজের মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি নির্ধারিত হয় সামষ্টিক গ্রহণযোগ্য আচরণ এবং ইথিকস তথা নৈতিকতার দ্বারা। সমাজের ভিন্নতায় মূল্যবোধের বিভিন্নতা দেখা যায়। মূল্যবোধ বিষয়টিকে বর্তমানে শুধু সামাজিক দিক থেকেই বিবেচনা করা হয় না।

বরং নাগরিক ও সমাজের কার্যকরণ ক্ষেত্র প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে মূল্যবোধও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়েছে। এ জন্য আধুনিক সমাজ গবেষকরা মানুষের মূল্যবোধকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করে থাকেন। গেইল এম ইনল (Gail M. Inlaw), এডওয়ার্ড স্প্রেঙ্গারস (Edward Sprangers), বি আর গোয়েল (B. R. Goel), পার্কার (Parker) প্রমুখ সমাজবিজ্ঞানীগণ মূল্যবোধকে বিভিন্নভাবে ভাগ করেছেন। যেমন-

১. সামাজিক মূল্যবোধ: সামাজিক মূল্যবোধ হলো সামাজিক শিষ্টাচার, সততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, শ্রমের মর্যাদা, শৃঙ্খলাবোধ, দানশীলতা, আতিথেয়তা, আত্মত্যাগ প্রভৃতি মানবিক সুকুমার বৃত্তির সমষ্টি।

সামাজিক মূল্যবোধ হলো মানুষের আচরণ বিচারের মানদণ্ড। সামাজিক মূল্যবোধের মাপকাঠিতে মানুষের কাজের ভালো-মন্দের বিচার করা হয়। সামাজিক মূল্যবোধ মানুষের আচরণকে পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণ করে সমাজকে একটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পরিচালিত করে।

২. রাজনৈতিক মূল্যবোধ: বর্তমান জাতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত। যে কারণে বর্তমানে রাজনৈতিক মূল্যবোধকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিচার বিবেচনা করা হয়। রাজনৈতিক আদর্শ, আনুগত্য, পরমতসহিষ্ণুতা, দায়িত্বশীলতা, দেশপ্রেম, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সহনশীলতা, শৃঙ্খলাবোধ প্রভৃতি বিষয় রাজনৈতিক মূল্যবোধের অংশবিশেষ।

ব্যক্তির রাজনৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে জাতীয় মূল্যবোধ, জাতীয় শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক মূল্যবোধ যদি গণতান্ত্রিক হয়, তবে ঐ রাষ্ট্র এবং সমাজ গণতান্ত্রিক সমাজ বা রাষ্ট্রে পরিণত হবে।


৩. নৈতিক মূল্যবোধ: নীতি ও উচিত-অনুচিত বোধ হলো নৈতিক মূল্যবোধের উৎস। অনেক ক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধকেই মূল্যবোধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মানুষ ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করে থাকে নৈতিক মূল্যবোধ দ্বারা।

অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং সত্য- মিথ্যার ভেদাভেদ মানুষ নৈতিক মূল্যবোধ দ্বারা নির্ধারণ করে থাকে। পরিবার, বিদ্যালয়, শিক্ষক, সমাজ প্রভৃতি থেকে মানুষ নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়ে থাকে। নৈতিক মূল্যবোধ ব্যক্তির জীবনকে উন্নত মানে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে ইজাজ উদ্দিন আহমেদ কায়কোবাদের কথা বলা যায়।

যিনি সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর নৈতিক মূল্যবোধের তাড়না থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছিলেন। উদ্ধার কাজের ৫ম দিনে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতর আটকা পড়া গার্মেন্টস কর্মী শাহিনা আকতারকে উদ্ধার করতে গিয়ে কংক্রিটের বিম কাটার চেষ্টাকালে অগ্নিদগ্ধ হন। তারপর চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয় এবং সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

৪. বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধ: বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধ বলতে বাস্তবিকভাবে কোনো বিষয়কে বোঝার সামর্থ্যকে বোঝায়। সমাজ বা পরিবেশ থেকে উদ্ভূত কোনো বিষয়কে যৌক্তিকভাবে গ্রহণ করার বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধের অংশ। এ মূল্যবোধ উত্তরাধিকার সূত্রে মানুষ পায় এবং নিজেও অর্জন করে। সমাজের কোনো বিষয়কে যদি কেউ যৌক্তিক দৃষ্টিতে গ্রহণ না করে তখন আমরা বলি 'পাগলামি' করছে। অর্থাৎ তার বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধের ঘাটতি রয়েছে।

৫. শারীরিক বা বাহ্যিক মূল্যবোধ: যে মূল্যবোধ মানুষের বাহ্যিক ব্যক্তিত্বকে গড়ে তোলে তাই হচ্ছে শারীরিক বা বাহ্যিক মূল্যবোধ। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা বিশেষ করে প্লেটো ও এরিস্টটল উভয়েই শারীরিক বা বাহ্যিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

সমাজবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড স্প্রেঙ্গার (Eduard Spranger) অবশ্য শারীরিক বা বাহ্যিক মূল্যবোধকে সৌন্দর্যবোধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একজন ব্যক্তির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাহসিকতা, সরলতা, পোশাক-পরিচ্ছদ প্রভৃতি তার শারীরিক বা বাহ্যিক মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত।

অনেকেই বাহ্যিক মূল্যবোধকে ব্যক্তিগত মূল্যবোধ হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকেন। মূল্যবোধটি অতিমাত্রায় আপেক্ষিক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন চাকরিজীবী নারী এবং একজন গৃহিণী উভয়ের মধ্যে যদি যাচাই করা হয় তবে দেখা যাবে এ মূল্যবোধ সম্পর্কে দুজন দু'ধরনের ধারণা পোষণ করছে।

৬. ধর্মীয় মূল্যবোধ: ধর্মীয় ঐতিহ্য, বিশ্বাস, গ্রন্থচর্চা প্রভৃতি থেকে উদ্ভূত মূল্যবোধকে ধর্মীয় মূল্যবোধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোকে পবিত্র মনে করা হয়। ধর্মবিশেষে ধর্মীয় মূল্যবোধ বিভিন্ন হয়ে থাকে। তবে ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্মান করা এবং মেনে চলা প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের কর্তব্য। আবার যে কোনো ধর্মের মূল্যবোধকে প্রাপ্য সম্মান দেওয়া, ধর্মীয় কার্যাদি পালনে স্বাধীনতা দেওয়াও ধর্মীয় মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত।

৭. সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ: মানুষ তার ধারণকৃত সংস্কৃতি থেকে যে সকল মূল্যবোধ গ্রহণ করে সেগুলোই সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ। সংস্কৃতি হচ্ছে সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তি অথবা সমাজস্থ কোনো গোষ্ঠীর জীবন প্রণালি। যার মধ্যে আছে কীভাবে তারা পোশাক পরবে, তাদের বিবাহ রীতি এবং পারিবারিক জীবন, কার্যপ্রণালি, অনুষ্ঠানাদি এবং বিশ্রাম সম্পর্কীয় কার্যাবলি ইত্যাদি।

সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত মূল্যবোধগুলো অনেক বেশি আপেক্ষিক। সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো সামাজিক প্রথা থেকেই বেশি পরিমাণে উদ্ভূত হয়। সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো মানুষের সামাজিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমাজের সদস্যদের মধ্যে 'আমরা-বোধ' (we-feeling) জাগ্রত করে সকলকে ঐক্য ও বন্ধুত্বের বন্ধনে বেঁধে ফেলে।

এখানে বর্ণিত মূল্যবোধগুলো ছাড়া আরও যে সব মূল্যবোধের কথা উল্লেখ করা যায় সেগুলো হলো অর্থনৈতিক, তাত্ত্বিক, দার্শনিক, তথ্য ও প্রযুক্তিগত মূল্যবোধ।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। মূল্যবোধের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Values) এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url