দেশি মুরগির ডিম ফুটানোর পদ্ধতি | মুরগির বাচ্চা উৎপাদন/ডিম ফুটানো

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে দেশি মুরগির ডিম ফুটানোর পদ্ধতি | মুরগির বাচ্চা উৎপাদন/ডিম ফুটানো নিয়ে আলোচনা করব।

দেশি মুরগির ডিম ফুটানোর পদ্ধতি

দেশি মুরগির ডিম ফুটানোর পদ্ধতি | মুরগির বাচ্চা উৎপাদন/ডিম ফুটানো - (Producing Chick/ Incubation), ভ্রূণযুক্ত উর্বর ডিম থেকে বাচ্চা জন্মায়। মোরগের সাথে মুরগির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুরগি উর্বর ডিম প্রসব করে। মুরগির উর্বর ডিম উৎপাদন কতিপয় বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। যেমন-

ক. ডিম পাড়া মুরগির পুষ্টি: মুরগি সুষম খাদ্য খেতে না পেলে উর্বর ডিম না দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অথবা বাচ্চা হলেও বাচ্চার বৃদ্ধি ভালো হবে না। ডিম ফোটানোর জন্য ভালো ডিম পেতে হলে মুরগিকে ৬-৮ সপ্তাহকাল সুষম খাদ্য দিতে হয়। মোরগ-মুরগির মিলনের অন্ততঃপক্ষে ৩ মাস আগ থেকে মোরগকেও সুষম খাদ্য দিতে হয়। কেননা ডিমের ভ্রূণের বৃদ্ধি ডিমের মধ্যেকার পুষ্টিকর উপাদানের ওপর নির্ভরশীল।

খ. রোগমুক্ত মুরগি ডিমের মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় রোগ বিস্তার লাভ করে। পুলোরাম, মুরগির টাইফয়েড, পক্ষাঘাত ইত্যাদি রোগগুলো ডিম দিয়ে ছড়ায়। তাই রোগমুক্ত মুরগি হতে ডিম নিয়ে ফোটানো উচিত।

গ. মোরগ-মুরগির বয়স মোরগ খুব তেজী হলে তার প্রজনন শক্তি ভালো হয়। তেজী মোরগের মিলনে উৎপন্ন ডিম হতে ভালো বাচ্চা হয়; এক্ষেত্রে বয়সের প্রভাব খুব কম। মোরগের বয়স বেশি হলে সে কম সংখ্যক মুরগির সাথে মিলিত হতে পারে। অন্যদিকে মুরগির বয়সের ওপর বাচ্চার উৎপাদন নির্ভর করে। তবে প্রথম বছরের ডিম পাড়ার-সময়ের শেষের দিকের ডিম থেকে ভালো বাচ্চা হয়।

ঘ. পালে ডিম উৎপাদন: যখন মুরগির ডিম উৎপাদন বেশি হয়, তখন সেই ডিম উর্বর হয় এবং তা থেকে বাচ্চা উৎপাদনও বেশি হয়। ডিমের উৎপাদন কম হলেও বৈশিষ্ট্যও হ্রাস পেতে থাকে। ডিমের উবর্বতা ও বাচ্চা উৎপাদন কিছু কারণের ওপর নির্ভর করে। যেমন-

  1. ঋতুর অবস্থা: গ্রীষ্ম ও বসন্তকালের প্রথম দিকের উৎপন্ন ডিমের উর্বরতা ও ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের হয়।
  2. পালে মোরগ-মুরগির সংখ্যা: পালে ১০-১২টি মুরগির সাথে ১টি করে স্বাস্থ্যবান ও তেজী মোরগ থাকলে মোরগ - মুরগির প্রজননের ফলে উর্বর ডিম পাওয়া যায়।
  3. প্রজননের-মোরগ-মুরগির সুস্থতা: সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান মোরগ-মুরগির প্রজননের ফলে উৎপন্ন ডিম স্বভাবতই উর্বর হয় ও তা থেকে ভালো বাচ্চা উৎপন্ন হয়।

মুরগির বাচ্চা উৎপাদনের জন্য ডিম নির্বাচন (Selection of eggs for hatching), বাচ্চা ফোটানোর ডিম সবদিক থেকে ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। নিম্নোক্ত নিয়মে ডিম নির্বাচন করলে সর্বাধিক বাচ্চা পাওয়া যেতে পারে। যথা-

  1. ডিমের আকার: সাধারণত ৫০-৫৫ গ্রাম ওজনের ডিম ভালো ফোটে। দুই কুসুমযুক্ত ডিম থেকে বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
  2. ডিমের আকৃতি: ডিমের আকৃতি মাঝারি ও স্বাভাবিক হওয়া উচিত। অর্থাৎ ডিম্বাকৃতির ডিম। আঁকাবাঁকা, বেশি লম্বা বা বিকৃত আকারের ডিম ফোটানোর জন্য নির্বাচন করা উচিত নয়।
  3. ডিমের খোসার রং ও মসৃণতা অপেক্ষাকৃত গাঢ়, মসৃণ ও মোটা ও শক্ত খোসা বিশিষ্ট ডিম বাচ্চা ফোটানোর জন্য। উপযোগী।
  4. ফাটা ডিম: আলোর সাহায্যে ফাটা ডিম পরীক্ষা করে অথবা একটি ডিমের উপর আর একটি ডিম রেখে আঘাত করলে সৃষ্ট শব্দ শুনে ফাটা ডিম শনাক্ত করা যায়।
  5. অপরিষ্কার ডিম: পরিষ্কার ডিম সবচেয়ে ভালো। তবে সামান্য ময়লা থাকলে তা শুকনা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করে নির্বাচন করতে হবে। কোনোক্রমেই ডিম পানি দিয়ে ধোয়া চলবে না।
  6. ডিমের ভিতরকার বৈশিষ্ট্য: মাঝখানে কুসুমবিশিষ্ট স্বচ্ছ ডিম বাচ্চা ফোটানোর জন্য উৎকৃষ্ট। যে ডিমের দু'ভাগ শ্বেতাংশ ও এক ভাগ হলুদ সেগুলোর বাচ্চা ফোটে বেশি। ডিমের ভিতর রক্তের ছিটা, ঘোলাটে বায়ু বুদবুদ সেগুলো ফোটে না।
  7. ডিমের বয়স: গরমের দিনে ডিম পাড়ার দিন থেকে ৩-৪ দিন এবং শীতকালে ৭-১০ দিনের মধ্যে হওয়া আবশ্যক।
  8. ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ: উর্বর ডিম উৎপাদনের মুরগির ঝাঁকের জন্য অবশ্যই ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ যুক্ত খাদ্য সরবরাহ করতে হবে, যা ডিমের নিষেক ও ডিম ভালোভাবে ফোটার জন্য সহায়ক। এরূপ প্রজনন ঝাঁকের ডিম। নির্বাচন করা উচিত।
  9. বাসগৃহ: বাসস্থান আলো বাতাসযুক্ত, সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, শুকনো ও আরামদায়ক হলে সেখানে পাড়া ডিমের নিষিক্ততার হার বেশি হয় বিধায় এরূপ স্থানের ডিম নির্বাচন করা উচিত।
  10. প্রজনন: অন্তঃপ্রজননকৃত ডিম ফোটার হার কম হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে ১০% অন্তঃপ্রজননে ৪.৪% ডিম ফোটার হার হ্রাস পায়। সংকরায়নকৃত ডিমের ফোটার হার বেড়ে যায়।
  11. ঋতুর প্রভাব: গ্রীষ্মকালে ডিম নিষিক্ত হওয়া ও ফোটার হার বেশি বিধায় এ সময়ের ডিম ফোটানোর জন্য নির্বাচন করা উচিত।
  12. বয়স: প্রজনন ঝাঁকের মুরগির ডিম পাড়া শুরু হওয়ার ৬-৮ সপ্তাহ পরের ডিমের স্ফুটন ক্ষমতা বেশি। তবে বয়স্ক মুরগির ডিমের স্ফুটন ক্ষমতা কম হয়। তাই এদের ডিম নির্বাচন মোটেই উচিত নয়।
  13. ঝাঁকে মোরগ-মুরগির অনুপাত: ভারী জাতের ৮টি মুরগির জন্য ১টি এবং হালকা জাতের ১০টি মুরগির জন্য ১টি মোরগ প্রজননের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে উর্বরতা সঠিকভাবে পাওয়া যায়। আর এরূপ ঝাঁকের মুরগির ডিমই নির্বাচন করা উচিত।
  14. নরম খোলসযুক্ত ডিম: খাদ্যে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ ও ভিটামিন-ডি এর অভাব হলে ডিমের খোলস নরম হয়। এ জাতীয় ডিম ফোটানোর জন্য অনুপযুক্ত।

ফোটানোর অনুপযোগী ডিম: অস্বাভাবিক ডিমও ফোটানোর জন্য উপযুক্ত নয়। যেমন- 
  • দুই কুসুমযুক্ত ডিম: এ ঘটনা বয়স্ক মুরগি অপেক্ষা পুল্টে বেশি হয়।
  • মাংসের চিহ্ন: এক্ষেত্রে ডিমের কুসুম বা অ্যালবুমিনে (ডিমের সাদা অংশ) মাংসের চিহ্ন পাওয়া যায়।
  • রক্তের চিহ্ন: ভিটামিন 'এ' এর অভাব এবং অন্যান্য পুষ্টি সমস্যায় ডিম্বাশয়ে বা ডিম্বনালীতে ছোট ব্লাড ভেসেল এ হেমোরেজের ফলে রক্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। অ্যালবুমিনে বা ডিমের খোসায় রক্তের চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে যে ডিম্বনালীতে হেমোরেজ হয়েছে। তবে এ ডিম ফোটানোর জন্য অনুপযুক্ত।
  • বিবর্ণ কুসুম: অ্যামোনিয়া এবং অন্যান্য রঙের বস্তুসমূহের অভাবে ডিমের কুসুম বিবর্ণ হতে পারে। তবে এ অভাব ভুট্টা বা ভুট্টার খাবার পোল্ট্রির রেশনে সরবরাহ করলে উপকার হয়। বিবর্ণ কুসুম ফোটানোর জন্য অনুপযুক্ত। 
  • ডিমে দুর্গন্ধ: পোল্ট্রি রেশনে দুর্গন্ধ থাকলে বা নিম্ন মানের ফিসমিল খাওয়ালে ডিম দুর্গন্ধযুক্ত হতে পারে, যা ফোটানোর জন্য অনুপযুক্ত।
  • নতুন পাড়া পচা ডিম: পোল্ট্রির ডিম্বনালীতে অসুখ বা ভেন্ট এ ধাতুক্ষয় রোগ থাকলে এ রকম ডিম পাড়তে পারে যা ফোটানোর উপযোগী নয়।

বাচ্চা ফোটানোর জন্য নির্বাচিত ডিম সংরক্ষণ (Preservation of eggs after selection for hatching): ফোটানোর জন্য ডিম নির্বাচন করে উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করা না হলেও ডিম অনুপযোগী বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর ওপর ডিম ফোটার হার অনেক নির্ভর করে। যেমন-

  • তাপমাত্রা: বাচ্চা ফোটার ডিম সংরক্ষণের আদর্শ তাপমাত্রা হলো ৫০-৬০° ফাঃ বা ১০° সে.। তবে তাপমাত্রা কখনোই ০° সে. এর কম বা ২৭° সে এর বেশি হওয়া যাবে না, কারণ এতে ডিমের ভ্রূণ মারা যাবে। অর্থাৎ খুব ঠাণ্ডা বা খুব বেশি গরম উভয়ই ক্ষতিকর।
  • আর্দ্রতা: বাচ্চা ফোটানোর ডিম সংরক্ষণের জন্য ৬৫% ৭০% অর্দ্রতা উপযুক্ত। অর্দ্রতা কম হলে ডিমের জলীয় ভাগ বায়ুতে বের হয়ে আসতে পারে, যার ফলে ডিম ফোটার ক্ষমতা হ্রাস পায়।
  • ডিম নাড়াচাড়া করা: ফোটানোর জন্য নির্বাচিত ডিমের সরু প্রান্ত নিচে এবং মোটা প্রান্ত উপর দিকে রেখে ট্রেতে সাজিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়।
  • ডিমের বয়স বা সংরক্ষণ সময়: মুরগির ডিম ১০° সে.- ১৫.৫° সে. তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে ৭ দিন ভালো থাকে তবে তাপমাত্রার উপর সংরক্ষণ সময়কাল নির্ভর করে।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে বাছাইকৃত ডিম সংরক্ষণ: ডিমের খোসায় অসংখ্য ছিদ্র থাকে। তাই ময়লা ডিমের খোসার ছিদ্র বন্ধ করে দিলে ভ্রূণের মৃত্যু ঘটতে পারে।
মুরগির ডিমের গ্রেডিং:

মুরগির ডিমের গ্রেডিং

ডিম অনুর্বর হওয়ার কারণ:

ডিম উর্বর না হলে তা বাচ্চা ফোটানোর জন্য ব্যবহার করা যাবে না। উর্বর ডিম মোরগ এবং মুরগির মিলনের ফলে সাধারণভাবে তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু অনেক সময় এর কিছু ব্যতিক্রম হয়ে যায়। তার কারণগুলো হলো-

১. ৮-১০টি মুরগির জন্য ঝাঁকে ১টি সুস্থ সবল মোরগ থাকা দরকার। তা-না হলে মুরগির ডিম অনুর্বর হবে।

২. দুর্বল, রুগ্ন এবং কোনো কারণে অক্ষম মোরগ দলে থাকলে উর্বর ডিম তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে না।

৩. মুরগির বয়স বেশি হলে সাধারণত প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়। তাই এ অবস্থায় বেশিরভাগ উৎপন্ন ডিম অনুর্বর হয়ে থাকে।

৪. খামারে বা ঝাঁকে মুরগির তুলনায় কম মোরগ থাকলে সেখানে উৎপাদিত ডিম অনুর্বর হতে পারে।

৫. খামারে বা ঝাঁকে মোরগ রাখা হলে যদি সে মোরগ সঙ্গমে আগ্রহী না হয় তাহলে সে খামারের ডিম অনুর্বর হতে পারে।

৬. বেশি দিনের পুরানো ডিমে ভ্রূণ সৃষ্টি না হওয়া।

৭. ডিম ময়লাযুক্ত অবস্থায় থাকলে ডিমের খোসার মধ্য দিয়ে জীবাণু প্রবেশ করে ডিমকে নষ্ট করে দিলে তা অনুর্বর হবে।

৮. উন্নত জাতের মুরগির ২৪ সপ্তাহ বয়সের আগের ডিমের চেয়ে তার পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ১ বছরের মধ্যের ডিমের উর্বরতার হার বেশি লক্ষ করা যায়।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। দেশি মুরগির ডিম ফুটানোর পদ্ধতি | মুরগির বাচ্চা উৎপাদন/ডিম ফুটানো এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url