ইনকিউবেটরে ডিম ফুটানোর পদ্ধতি | ডিম ফুটানোর উপযুক্ত সময় নির্ধারণ

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে ইনকিউবেটরে ডিম ফুটানোর পদ্ধতি | ডিম ফুটানোর উপযুক্ত সময় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করব।

ইনকিউবেটরে ডিম ফুটানোর পদ্ধতি | ডিম ফুটানোর উপযুক্ত সময় নির্ধারণ

ডিম ফুটানোর উপযুক্ত সময় নির্ধারণ (Selection of suitable time for incubation), মুরগি ডিম পাড়ার পর পরই ইনকিউবেটরে বসালে ডিম ফোটার হার বেশি হয়। ডিম পাড়ার পর যত দেরি করে ফোটানোর জন্য বসানো হবে তত ডিম ফোটার হার কমে যাবে। ডিম ফোটানোর জন্য বসাতে দেরি হলে ডিম রাখার ঘরের আর্দ্রতা ৭০-৮০% এবং তাপমাত্রা ৬০-৬৫° ফাঃ এ ৭ দিন পর্যন্ত রাখা যায়। এরপর ৫৫-৫৮ ফা: রাখতে হয়। তবে ডিম ফোটানোর উপযুক্ত সময় সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। যেমন-
  1. বর্ষার সময় ডিম বেশি ফোটে। কিন্তু বাচ্চা বাঁচানো কষ্টকর হয়।
  2. গরমের সময় ডিম বেশি নষ্ট হয়।
  3. বর্ষার পর হতে গরম আসার আগ পর্যন্ত ডিম ফোটার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময় ডিম কম নষ্ট হয় এবং বাচ্চা রক্ষা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
  4. স্বাভাবিক উপায়ে ডিম ফোটাতে হলে মুরগির গায়ে উকুন নেই; এ অবস্থা নিশ্চিত করে নিতে হয়।
  5. মুরগির পায়ে আঁশ থাকবে না এমন অবস্থাসম্পন্ন মুরগিকে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে ডিম ফোটানোর জন্য বসানো যাবে।

যন্ত্রের সাহায্যে সারা বছরই ডিম ফোটানো যায়। তবে শীতকালকে বলা হয় ডিম ফুটানোর পক্ষে উপযুক্ত সময়। কারণ ঐ সময় বাচ্চারা বেশ স্বাস্থ্যবান হয়। এরপর ঐ সমস্ত বাচ্চা বড় হয়ে ৫ থেকে ৭ মাস পরে (জাত এবং শ্রেণি অনুসারে) ডিম দিতে শুরু করে। যে সমস্ত অঞ্চলে বারো মাস ঠান্ডা থাকে সেখানে শীতের সময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা থাকে, যা মুরগির ডিম ফুটানোর জন্য উপযুক্ত সময় নয়। কাজেই সেখানে মার্চ-জুন মাস পর্যন্ত সময় ডিম ফোটানোর জন্য সবচেয়ে অনুকূল সময়।

স্বাভাবিক উপায়ে ডিম ফোটাতে হলে মুরগির অভ্যাস যাচাই করে নেওয়া ভালো। এজন্য মুরগির ডিম পাড়ার শেষ পর্যায়ে মুরগি ডিমে 'তা' দেওয়ার জন্য বসতে চায় কি-না এবং কতটুকু যত্নশীল তা জানার জন্য নকল ডিম দিয়ে বসার অভ্যাস ২/৪ দিন দেখতে হয়। মুরগি 'তা' দিতে অভ্যস্ত মনে হলে রাতের অন্ধকারে নকল ডিম সরায়ে প্রকৃত ফোটানোর ডিম মুরগির নিচে দিতে হয়।

এছাড়া মুরগিকে যদি 'তা' দেওয়ার জন্য সাদা রঙের ডিম দেওয়া হয়, তাহলে পরে সে মুরগিকে অন্য রঙের ডিম তা দেওয়ার জন্য বসানো উচিত নয়। ডিম ফুটানোর পদ্ধতি প্রাকৃতিক পদ্ধতি, কৃত্রিম পদ্ধতি (ইনকিউবেটর), ইনকিউবেটরের শর্তাবলি। Methods of Incubation [Natural method, Artificial method (Incubator), conditions of incubation] উর্বর ডিম থেকে দু' উপায়ে ডিম ফোটায়ে বাচ্চা উৎপাদন করা যায়। যথা: (ক) প্রাকৃতিক ও(খ) কৃত্রিম পদ্ধতি।

ডিম ফোটানোর প্রাকৃতিক পদ্ধতি

নিষিক্ত ডিমের উপর মুরগির নিজের দেহের তাপ দিয়ে ডিম ফুটানোকে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ডিম ফুটানো বলে। এক্ষেত্রে দেশি মুরগি ব্যবহার করা হয়। তা দেওয়া মুরগিকে কুরচোনো বা কুইচ্যা বা কুরকী মুরগি বলে। নিচে ডিম ফুটানোর প্রাকৃতিক পদ্ধতির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

বাচ্চা ফোটানোর উপযোগী জায়গা

  • ঠান্ডা ও একটু অন্ধকার জায়গা হতে হবে বাসাটি চওড়া বা বাঁশের তৈরি ঝুঁড়ি হলে ভালো হয়।
  • বাসার চারদিক উঁচু ও গোলাকার হতে হবে। তবে বাতাস চলাচল করতে পারে এমন স্থানে বাসাটি বসাতে হবে।  স্যাঁতসেঁতে নোংরা স্থান অবশ্যই পরিহার করতে হবে।
  • বাসার মাঝখানটি একটু গভীর হতে হবে যাতে ডিম গড়ায়ে পড়তে না পারে।
  • মুরগির ডিম ফোটানোর জন্য বাসাটির কাছে গন্ধ ছড়ায় এমন কিছু রাখা যাবে না (কেরোসিন, পেঁয়াজ, রসুন, কারখানার ধোঁয়া বা বর্জ্য ইত্যাদি)।
  • বাসাটিতে নরম খড়কুটা বিছিয়ে দিতে হবে এবং ৬ দিন পর পর তা পাল্টিয়ে দিতে হবে।।
  • বাসার কাছাকাছি পরিষ্কার পাত্রে পরিষ্কার পানি রাখতে হবে।
  • বাসার কাছাকাছি একটি খাবার পাত্রে ধান, গম বা ভাঙা ভুট্টা রাখা যেতে পারে।
  • বাসার কাছাকাছি একটি চওড়া পাত্রে ১ ভাগ বালি, ২ ভাগ ছাই ও ১ ভাগ চুনের গুঁড়া এক সাথে মিশিয়ে রাখলে তাতে মুরগি গড়াগড়ি করতে পারবে।
  • মাঝে মাঝে বাসার ডিম দেখতে হবে। যদি কোনো ডিম ভেঙে যায়, তবে তা সরিয়ে ফেলতে হবে।

ডিমে মুরগি বসানোর উপযুক্ত সময়

  • মুরগিকে খাবার খাওয়ায়ে সন্ধ্যার পর ডিমে বসানো সুবিধাজনক। এতে মুরগি নিজেকে মানিয়ে নিতে সহজ হয়।
  • সন্ধ্যার দিকে ডিম বসালে ২১ দিনের সন্ধ্যার দিকে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় এবং সারারাত্রি বিশ্রাম পায়। ফলে বাচ্চা শক্ত সামর্থ্য হয়ে উঠতে পারে এবং পরবর্তী ধকল সামলাতে পারে।

প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ডিম ফোটানো

  1. আদিকাল হতে প্রাকৃতিক উপায়ে মুরগি ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়ে আসছে। বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে এ পদ্ধতি এখনো চলছে।
  2. বিদেশি ও উন্নত জাতের মুরগিকে ডিমে তা দিতে অভ্যন্ত বা ব্যবহার করা উচিত নয়।
  3. পারিবারিকভাবে মুরগি লালন-পালনের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিতে ডিম ফোটানো যেতে পারে।
  4. এ পদ্ধতিতে ডিম ফোটানোর জন্য মুরগিটি হতে হবে স্বাস্থ্যবান এবং 'তা' দিতে অভ্যস্ত, মুরগির বাসাটি/কুড়িটি পরিষ্কার ও রোগজীবাণু মুক্ত।
  5. মুরগিটি শান্ত স্বভাবের, আকারে বড় এবং বেশি পালকযুক্ত হলে সবচেয়ে উপযোগী হবে।
  6. ডিমে 'তা' দেওয়ার মুরগিটি ১ বছরের কম বয়সী হওয়া উচিত নয়। কেননা অল্পবয়সী মুরগি ডিমে 'তা' অবস্থার ১১-১২ দিনে সাধারণত উঠে যেতে চায়।
  7. একটি মুরগির নিচে ৮-১০টি ডিম 'তা' দেওয়ার জন্য ভালো। তবে ১৫-২০ টি পর্যন্ত মুরগির স্বাস্থ্যের ও চেহারার উপর নির্ভর করে দেওয়া যেতে পারে।
  8. পালক বদলাচ্ছে এমন মুরগি ডিমে 'তা' দেওয়ার জন্য বসানো উচিত নয়।
  9. দেশি মুরগিতে বিদেশি মুরগির ডিম ফোটাতে হলে রাতে নির্বাচিত ডিম 'তা' দেওয়া মুরগির নিচে দিতে হবে।
  10. বয়স্ক মুরগি সাধারণত মাতৃত্বদানে গভীর মনোযোগী হয়। এ জাতীয় মুরগিটি ডিমে 'তা' দিতে কুঁচে বসে থাকবে এবং এ অবস্থায় ২১ দিনে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হবে।
  11. ডিমের বয়স ১-৭ দিনের হলে সাধারণত সে সমস্ত ডিম হতে ২১ দিনের পর প্রায় একই সময়ে সবগুলো ডিম ফোটবে এবং বাচ্চা বের হবে। লক্ষ রাখতে হবে রাতে ডিম বসালে রাতের বেলায় ডিম ফোটবে। আর তাতে পরবর্তী দিন। সকাল হতে বাচ্চার যত্ন নেওয়া সম্ভব হবে।
  12. মুরগির বাসাটি ৩৭.৫০ সে. মি. ব্যাস এবং ২০ সে. মি. গভীর হলে সবচেয়ে ভালো (মাটির, বাঁশের, বেতের, টিনের দ্বারা তৈরি করা যায়)।
  13. মুরগির বাসাটির ৪ ভাগের ৩ ভাগ ছাই, কাঠের গুঁড়া, ধানের তুষ দিয়ে ভর্তি করে তার উপর হালকাভাবে নরম খড় বিছিয়ে চতুর্দিক দিয়ে ঘিরে খড় দ্বারা চৌহদ্দির ন্যায় করে দেওয়া যেতে পারে।
  14. মুরগিকে 'তা' দেওয়ার জন্য খুঁড়িতে ডিম বসানোর সময় ডিমের সরু অংশটি নিচের দিকে করে বসাতে হবে। মুরগি স্বাভাবিক নিয়মে তার প্রয়োজনমতো উল্টে-পাল্টে নিয়ে থাকবে।
  15. 'তা' দেওয়া মুরগিকে দিনে দুই বার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। আর খাবার পাত্রও তার সাথে কাছাকাছি রাখতে হবে, যাতে সহজে মুরগি দেখতে পায়।
  16. মুরগির খাবার যাতে সুষম হয় তা নিশ্চিত করা উচিত।
  17. মুরগি যাতে কিছু সময়ের (১০ মিনিট) জন্য বের হতে পারে, সেভাবে যাতায়াতের সুবিধা রাখতে হবে।
  18. একটা মুরগি দিয়ে 'তা' দেওয়ার সময় ১০৬০-১০৭° ফা, উত্তাপ বজায় থাকে। আর 'তা' দেওয়ার সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থাৎ ২১ দিন ডিমের উপর বসে থাকে। তাই সুষম খাদ্য দেওয়া জরুরি। এসময় মুরগিকে জীবাণুমুক্ত (উকুন, আঁঠাল) রাখতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জীবাণুনাশক পাউডার মুরগির গায়ে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
  19. ডিমে 'তা' দেওয়ার সময় মুরগিকে ভয় দেখিয়ে বা জোর করে তাড়িয়ে সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
  20. ডিমে 'তা' দেওয়া অবস্থায় মুরগির প্রয়োজনীয় আর্দ্রতার অভাব ঘটে। সে জন্য মুরগির পেটে ঘা হতে পারে। তাই ১৮ দিনের মাথায় মুরগিকে ডিমের উপর হতে তুলে হালকা গরম পানিতে পেট ও শরীরের নিচের অংশ কিছুক্ষণ ডুবিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
  21. ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়ার পর মাকে সাথে সাথে সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়। এ সময় 'মা' মুরগি যাতে সরে না যায় সে জন্য ট্রেতে খাদ্য দিয়ে মুখের কাছাকাছি রাখা যেতে পারে।
  22. যে ডিমগুলো হতে বাচ্চা বের হচ্ছে না সেগুলো তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিয়ে গর্ত করে পুঁতে রাখতে হবে। আর মুরগির ব্যবহৃত দ্রব্যাদিও পরবর্তীতে পুঁতে রাখতে হবে।

মুরগির ডিমে তা দেওয়ার প্রবৃত্তি দূর করা:
  1. মুরগিকে প্রয়োজনের বেশি খাবার দেওয়া চলবে না।
  2. ডিম পাড়ার পর সাথে সাথে তা বাক্স/পাত্র থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
  3. কোরক মুরগিকে (ডিম ফুটানোর কুরচোনো মুরগি বাদে অন্য যেসব মুরগির কোরক কুঁচে স্বভাব হতে পারে) ঝাঁক থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
  4. কুরচোনো প্রবৃত্তি প্রকট হলে পানিতে ডুবিয়ে দিতে হবে এবং পা দুটোকে হাত দিয়ে টেনে দিতে হবে। এছাড়াও পায়ে দড়ি বেঁধে অল্পক্ষণ ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
  5. বাক্সের মেঝেতে জালি দিয়ে এরূপ দু'ফুট মাপের বাক্সে মুরগিকে রাখতে হবে। কেননা জালের উপর মুরগি বসে থাকতে অস্বস্তি বোধ করে, ফলে কুরচোনো অভ্যাস ত্যাগ করে।

প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ডিম ফুটানোর সুবিধা-অসুবিধা

সুবিধা

১. অল্প সংখ্যাক ডিম ফুটানো সহজ, লাভজনক এবং ব্যয়সাধ্য নয়। 
২. এতে ব্যয়বহুল কোনো যন্ত্রের দরকার হয় না। তাই ঝামেলা কম।
৩. এ পদ্ধতিতে মুরগি নিজেই বাচ্চা লালন-পালন করে।

অসুবিধা

১. ডিম ফোটার আগেই মুরগি তা দেওয়া ছেড়ে দিলে ডিম নষ্ট হয়ে যায়।
২. মুরগির বসার দোষে বা অস্থিরতায় অনেক সময় ডিম ভেঙে যায়।
৩. ডিমে তা দেওয়াকালীন সময় মুরগি ডিম দেয় না, ফলে ডিম. কম হয়।
৪. এক সাথে প্রয়োজনে বেশি বাচ্চা ফুটানো সম্ভব হয় না।
৫. মুরগির কুচরোনো সময়মতো না হলে, চাহিদাকৃতভাবে বাচ্চা ফুটানো সম্ভবপর নয়।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। ইনকিউবেটরে ডিম ফুটানোর পদ্ধতি | ডিম ফুটানোর উপযুক্ত সময় নির্ধারণ এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url