পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব।

পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক

পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক (Relationship of Civics & Good Governance with History), পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। পৌরনীতি ও সুশাসনের সাহায্য ছাড়া ইতিহাসের পথচলা যেমন কঠিন, তেমনই ইতিহাসের সাহায্য ছাড়াও পৌরনীতি ও সুশাসনের এগিয়ে যাওয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

ক. পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। ইতিহাস অতীত ঘটনাবলি ও প্রতিষ্ঠানসমূহের দলিলস্বরূপ। অন্যদিকে পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকতার বিজ্ঞান। এ বিষয়টির মাধ্যমে নাগরিকতার অতীত সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়। বর্তমানের নাগরিকতা এবং নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হলে অতীতের নাগরিকত্যর রূপ এবং অধিকার ও কর্তব্য সম্বন্দ্বে যথাযথ জ্ঞান থাকা আবশ্যক। তাছাড়া পৌরনীতি ও সুশাসনে আলোচিত প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতে কীৰূপ ছিল তা ইতিহাস পাঠের মাধ্যমেই জানা যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, কোন প্রেক্ষাপটে প্রাচীন গ্রিসে 'নগররাষ্ট্র' (City State) গড়ে উঠেছিল এবং আধুনিককালে সেখানে কেন ও কীভাবে বৃহত্তর 'জাতি রাষ্ট্রের' (Nation State") উদ্ভব ঘটেছে তার সঠিক ব্যাখ্যার জন্য সে দেশের ইতিহাস সম্বন্দ্বে সুষ্ঠু জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

খ. পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস একে অপরের পরিপূরক। ইতিহাস যেমন পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠে সাহায্য করে, তেমনি পৌরনীতি ও সুশাসন ইতিহাস পাঠে সহায়তা করে। পৌরনীতি ও সুশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস লিপিবদ্ধ না হলে সে ইতিহাস খণ্ডিত ও কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আবার পৌরনীতি ও সুশাসনকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা না হলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ ঐতিহাসিক সিলি (Seeley)- বলেছেন, 'ইতিহাস ছাড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানের (পৌরনীতি) কোনো ভিত্তি নেই; আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান (পৌরনীতি) ছাড়া ইতিহাসের কোনো মূল্য নেই।' (History without political science has no fruit, and political science without history has no root)

গ. পৌরনীতি ও সুশাসন ইতিহাসের দ্বারা সমৃদ্ধ। কেননা ইতিহাস হলো পুরনো দলিলের মতো। প্রাচীনকালের সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্র সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য, নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য, সমাজের বিবর্তন, অতীতের সরকার ও রাজনীতি, আইনের স্বরূপ ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে ইতিহাসের সাহায্য নিতে হয়।

ঘ. ইতিহাস রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চেয়ে বিস্তৃত হলেও স্বাধীন নয়। যারা ইতিহাস রচনার কাজটি করেন তাদের পক্ষে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনেতাকে পাশ কাটিয়ে বা রাষ্ট্রশক্তিকে তোয়াক্কা না করে কাজ করা সম্ভব নয়। অনেক সময় ইতিহাসবিদদের রাষ্ট্রশক্তির ইচ্ছা বা মতানুসারে ইতিহাস রচনা করতে হয় যার ফলে তা পক্ষপাতদুষ্ট হয়। এজন্য পৌরনীতি ও সুশাসন আলোচনার ক্ষেত্রে ইতিহাস বড় নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হয়।

ঙ. পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস একে অপরকে প্রভাবিত করে। পৌরনীতি ও সুশাসনের অন্তর্গত বিষয়বস্তু আদর্শ মানব ইতিহাস নির্মাণে সাহায্য করেছে। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সাম্যের মতো ধারণা এবং মার্কসবাদ, পুজিবাদ ও ফ্যাসিবাদ ইত্যাদি মতাদর্শের উন্মেষ ও প্রভাবের ইতিহাস পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব।

চ. ইতিহাস রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে। রাজনৈতিক মতবাদসমূহ বা প্রাচীন রাষ্ট্রগুলোর বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ইতিহাস না থাকলে কারো কাছে তা কাল্পনিক বলে মনে হতেও পারতো। কাজেই ইতিহাসের বর্ণনার সমর্থন রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিশ্বাসযোগ্য করে। ইতিহাস থেকে সংগৃহীত তথ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে অধিক সমৃদ্ধ ও বিজ্ঞানভিত্তিক করে তোলে।

পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য

পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাসের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও উভয়ের মধ্যে পার্থক্যও কম নয়। তাদের মধ্যে নিম্নলিখিত পার্থক্য বিদ্যমান-

  1. পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনার বিষয়বস্তুর চেয়ে ইতিহাসের বিষয়বস্তু ব্যাপক। রাজনৈতিক বিষয়াবলি ছাড়াও ইতিহাসে সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম, ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ জীবনের কার্যত সকল ক্ষেত্রের ঘটনাবলির বিবরণ থাকে। অন্যদিকে পৌরনীতি ও সুশাসনের বিষয়বস্তু শুধু রাষ্ট্র, সরকার এবং সমাজবদ্ধ মানুষের রাজনৈতিক কার্যাবলি ও নাগরিকের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সমস্যার আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পৌরনীতি ও সুশাসন রাজনৈতিক বিবর্তনের সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলোকেই বেছে নেয়। কানাডীয় লেখক স্টিফেন লিকক (Stephen Leacock") বলেন, ইতিহাসের কিছুটা পৌরনীতির অংশ, পুরোটা নয়।
  2. পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনার ক্ষেত্রে ইতিহাস থেকে উপাদান ও তথ্য সংগ্রহ করা হলেও উভয়ের আলোচনার প্রকৃতি ও পদ্ধতি আলাদা। ইতিহাসের আলোচনা বর্ণনামূলক, কিন্তু পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনা দর্শনমূলক। ইতিহাসের আলোচনা বাস্তবভিত্তিক, সেখানে নৈতিকতা ও মূল্যমান বিচার-বিশ্লেষণ মুখ্য নয়। পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে তত্ত্ব ও অনুসন্ধানে। অন্যদিকে ইতিহাস আলোচিত হয় তথ্য ও বর্ণনার নিরিখে। সুতরাং আলোচনার ক্ষেত্র ও পদ্ধতি অনেক দিক থেকেই আলাদা।
  3. ইতিহাস তার আলোচ্য বিষয়ের ক্ষেত্রে অতীতের বিভিন্ন ঘটনার পাশাপাশি সমসাময়িক অর্থনীতি, পরিসংখ্যান, মনস্তত্ব, শিল্প, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়কে স্থান দেয়। অন্যদিকে পৌরনীতি ও সুশাসন এক্ষেত্রে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করে।
  4. নৈতিকতা সম্পর্কিত ধারণায়ও উভয় বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। পৌরনীতি ও সুশাসনকে নৈতিকতা থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করা যায় না। পৌরনীতি ন্যায়নীতি, উচিত-অনুচিত ইত্যাদি মূল্যবোধ সম্পর্কিত বিষয়গুলোও আলোচনা করে। অন্যদিকে ইতিহাস মূলত কালানুক্রমিকভাবে ঘটনার বর্ণনা করে যায় এবং ন্যায়নীতি, উচিত-অনুচিতের প্রশ্নে উদাসীন থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস পরস্পরের পরিপূরক ও সহায়ক। একটি ছাড়া অপরটির আলোচনা ভিত্তিহীন।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url