সুশাসনের প্রতিবন্ধকতা উত্তরণের উপায়

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে সুশাসনের প্রতিবন্ধকতা উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করব।

সুশাসনের প্রতিবন্ধকতা উত্তরণের উপায়

সুশাসনের প্রতিবন্ধকতা উত্তরণের উপায় (Means of Unraveling the Obstacles of Good Governance), কোনো রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সুশাসনের সমস্যাগুলো দূরীকরণে সরকারের পাশাপাশি জনগণকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় কাজে সুশীলসমাজসহ সব সচেতন নাগরিকের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে সমস্যাগুলোর সমাধানে আমরা যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি তা নিচে আলোচনা করা হলো:-

১. নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি: সুশাসনের অন্যতম উপাদান সরকারের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য জনগণের সচেতনতা প্রয়োজন। আবার নাগরিকদের সচেতনতার জন্য প্রয়োজন রাজনীতি, পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ে শিক্ষা। নাগরিকরা যদি এসব শিক্ষার মাধ্যমে তাদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়, তবে তাদের পক্ষে উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ সম্ভব হবে।

এর ফলে সুশাসন বাস্তবায়নের জন্য গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে সুশাসন বাস্তবায়নের পথে ই-গভর্নেন্সকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর জন্য নাগরিকদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কিত কিছু জ্ঞানও প্রয়োজন।

২. শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা: শুদ্ধাচার বলতে সাধারণভাবে উন্নত নৈতিকতা ও ও সততাভিত্তিক আচরণ ও কার্যকলাপকে বোঝায়। ব্যক্তি পর্যায়ে শুদ্ধাচারের অর্থ হলো কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা। রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হলো নাগরিক।

কার্যত নাগরিকরাই একটি দেশের সরকার, প্রশাসন, উদ্যোক্তা, ভোক্তা, সেবা দাতা, সেবা গ্রহীতা, ভোটার, নির্বাচন কর্মকর্তা বা নেতা-কর্মী। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের সবকিছুই নাগরিককেন্দ্রিক। তাই সুশাসন সুশা প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধাচারের পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়ে শুদ্ধাচারের চর্চা করতে হবে।

৩. দুর্নীতি প্রতিরোধ: যে কোনো দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হচ্ছে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা। দুর্নীতি জাতীয় সম্পদের সঠিক বণ্টনে বাধা প্রদান এবং ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে।

খ্যাতনামা প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক কৌটিল্যও তার 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থে সুশাসনের চারটি উপাদানের কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল দুর্নীতিমুক্ত শাসন (Corruption free governance)। এ যুগে বিশ্বব্যাংক সুশাসনের জন্য যে ছয়টি সূচক চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে ষষ্ঠটি হচ্ছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ (Corruption control)। অর্থাৎ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

৪. দারিদ্র্য বিমোচন: দারিদ্র্য সুশাসনের অন্যতম বাধা। দারিদ্র্য নাগরিকের অধিকার অর্জনের প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। এটি বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অন্যতম কারণ। এজন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে দারিদ্র্য বিমোচনে পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। গোটা বিশ্বেই সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে দারিদ্র্য। বিমোচনের কাজ চলছে।

বর্তমান বিশ্বে সুশাসন বিদ্যমান রয়েছে এমন একটি রাষ্ট্র হলো যুক্তরাজ্য। এ দেশের তৎকালীন রাজা অষ্টম হেনরি ১৫৩১ সালে দারিদ্র্য মোকাবিলার জন্য সরকারি পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এরপর পার্লামেন্ট ১৬০১ সালে এলিজাবেথীয় দরিদ্র আইন (Elizabethan poor Law, 1601) পাশ করে।

এ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে গ্রেট ব্রিটেনের ইতিহাসে সর্বপ্রথম দরিদ্র ও অসহায় লোকদের অভাব মোচনের দায়িত্ব সরকারিভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দারিদ্র্য বিমোচন করা হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।

৫. গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ, শক্তিশালী ও গতিশীল করতে হবে। গণতন্ত্র একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের চোখ দিয়ে জনগণকে দেখা নয়, বরং জনগণের চোখ দিয়ে রাষ্ট্রকে দেখার অনুশীলনই গণতন্ত্রের লক্ষ্য।

এর জন্য প্রয়োজন জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গণতন্ত্রের চর্চা। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ও আচরণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

৬. স্বশাসিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কার্যকর থাকা: সুশাসনের একটি পূর্বশর্ত হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ে স্বশাসিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর থাকা। স্থানীয় পর্যায়ের স্বশাসিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলতে সাধারণ স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে বোঝায়।

স্থানীয়ভাবে জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত, স্থানীয় জনগণের জন্য এবং স্থানীয় জনগণের কাছে দায়ী প্রতিষ্ঠানসমূহ হলো স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকারের উদাহরণ।

৭. উগ্রবাদের বিস্তার রোধ: যে কোনো প্রকার উগ্রবাদ সুশাসনের পথে অন্তরায়। নাগরিকদের সুশিক্ষা ও সচেতনতার অভাব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, উন্নয়নে বৈষম্য, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিতিশীলতা বা বন্ধ্যাত্বের কারণে উগ্রবাদের বিস্তার হয়ে থাকে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয়, জাতিগত বা সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

উগ্রবাদ প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা কাঠামো সংস্কার, উন্নয়ন বৈষম্য হ্রাস ইত্যাদির উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক। উগ্রবাদ রাষ্ট্রের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে। বর্তমান বিশ্বে যে সব রাষ্ট্রে উগ্রবাদের অস্তিত্ব রয়েছে সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা যেন অলীক কল্পনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সব ধরনের উগ্রবাদের বিস্তার রোধে সরকার ও নাগরিক সমাজের প্রত্যেককেই এগিয়ে আসতে হবে।

৮. গণমুখী সেবা উদ্ভাবন: সুশাসনের সমস্যা সমাধানের অন্যতম উপায় হলো গণমুখী সেবা উদ্ভাবনে জোর প্রদান। উদ্ভাবনী উদ্যোগের জন্য সৃজনশীলতার চর্চা প্রয়োজন। সেবা খাতে 'উদ্ভাবন' (Innovation) শাব্দিক অর্থে নতুন ধারণা বা পদ্ধতিকে নির্দেশ করে। গণমুখী সেবা উদ্ভাবনের অন্যতম লক্ষ্য থাকে স্বল্প সময় ও ব্যয়ে অধিকতর উন্নত সেবা প্রদান, নতুন প্রয়োজন পূরণ ও বিদ্যমান সমস্যার সহজ সমাধান দেওয়া।

এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, গণমুখী সেবা উদ্ভাবনে জোর প্রদান সুশাসনের সমস্যা সমাধানের অন্যতম উপায়। দেশে সরকারের ই-গভর্নেন্স বিষয়ক প্রকল্প 'অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রাম' নাগরিক সেবায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

৯. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা: আইনের শাসন সুশাসনের পথ সুগম করার একটি প্রধান সহায়ক উপাদান। রাষ্ট্রে আইনের শাসন বলবৎ থাকলে স্বেচ্ছাচার, দুর্নীতি ও অপরাধের মতো সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে। নাগরিকরা সমানভাবে তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে শান্তি বিরাজ করে। আর আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক সরকার।

১০. স্বাধীন বিচার বিভাগ: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে আইনের ব্যাখ্যা দান ও বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিচারকদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষমতাকে বোঝায়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হলো স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিরোধক অস্ত্র। এটি ছাড়া সভ্য নাগরিক জীবন কল্পনাতীত। গণতান্ত্রিক আদর্শ ও প্রক্রিয়া সংরক্ষণের পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।

১১. জবাবদিহিমূলক প্রশাসন: সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালক থেকে শুরু করে সর্বস্তরে শাসন কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বা দায়বদ্ধতার নীতি থাকা অপরিহার্য। লক্ষ্য অর্জনে এবং কাজ সম্পাদনে কার কী দায়িত্ব এবং কার কাছে জবাবদিহি করতে হবে তা আগেই নির্ধারণ করতে হবে।

কেননা সরকারি নীতিনির্ধারণ ও নীতি বাস্তবায়নে যদি প্রশাসনিক জবাবদিহিতা না থাকে তাহলে সিদ্ধান্ত পক্ষপাতদুষ্ট, বিলম্বিত বা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। এটি সুশাসনের জন্য অন্তরায়। ব্যর্থতা ও ত্রুটির দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে-এমন চাপের মধ্যে থাকলে কর্মকর্তা- কর্মচারিরা অর্পিত দায়িত্ব পালনে সতর্ক হবেন। তাই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসনকে এগিয়ে নেওয়া যায়।

১২. আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: আমলারা হচ্ছেন একটি দেশের প্রশাসনের চালিকাশক্তি। তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্বপালন না করে ক্ষমতা ও পদের অপব্যবহার করেন, তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্র সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারবে না। এ কারণে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য আমলাতন্ত্রের ওপরও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা একান্ত প্রয়োজন।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। সুশাসনের প্রতিবন্ধকতা উত্তরণের উপায় এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url