সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের করণীয়

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের করণীয় নিয়ে আলোচনা করব।

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের করণীয়

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের করণীয় (Role of Government in Establishing Good Governance), রাষ্ট্রের যাবতীয় কার্যাবলি সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে সরকার। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার যে সব ভূমিকা পালন করতে পারে তা নিচে আলোচনা করা হলো-

১. অংশীদারিত্বমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ: সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো একটি অংশীদারিত্বমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা (Participative Development Plan) গ্রহণ। অংশীদারিত্বমূলক পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট দেশটির জন্য সবচেয়ে বেশি টেকসই উন্নয়নের (Sustainable Development) পথ নির্দেশ করে।

অংশীদারিত্বমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এর আওতায় কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশের অধিবাসীদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ সাধনের জন্য সুষ্পষ্ট লক্ষ্য স্থির করা হয়। সামাজিক সম্পদসমূহের ন্যায্য বিলি-বণ্টন ও ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্রনিযুক্ত সুনির্দিষ্ট সংস্থা দ্বারা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার বিশদ সমীক্ষা ও গভীর বিবেচনার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এ উন্নয়ন পরিকল্পনায়। এতে করে রাষ্ট্রে সম্পদের সুষম বণ্টন ও উন্নয়ন হয়ে থাকে।

২. মানবসম্পদের উন্নয়ন: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের আর একটি করণীয় হলো মানবসম্পদ উন্নয়নের উদ্যোগ ২ নেওয়া। মানবসম্পদ উন্নয়ন বলতে দেশের জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলাকে বোঝায়। ভৌত পুঁজি (Physical Capital) অর্থাৎ কলকজা, যন্ত্রপাতি, দালানকোঠা, জমিজমা ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব হলেও মানবিক উন্নয়ন সাধিত হয় না।

সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অবকাঠামোগত ও মানবিক উন্নয়ন উভয়টিরই প্রয়োজন রয়েছে। মানবিক উন্নয়ন সম্ভব না হলে মানবসম্পদের ঘাটতি সুশাসনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। মানবিক উন্নয়ন বলতে ব্যক্তির নিজের ব্যক্তিত্বের উন্নয়নকে বোঝায়। জাতিসংঘের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণাপত্রে পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ মাহবুবুল হক মানবিক উন্নয়ন বলতে বেশ কিছু সূচকের (Indicator) উন্নয়নের কথা বলেছেন। সূচকগুলো হচ্ছে- (১) শিক্ষা, (২) স্বাস্থ্য, (৩) জীবনকাল, (৪) মাথাপিছু আয়, (৫) নারী উন্নয়ন, (৬) শিশুস্বাস্থ্য, (৭) মৃত্যুহার হ্রাস ইত্যাদি। তার মতে, এসব সূচকের (Indicator) উন্নয়নের মাধ্যমে কোনো দেশের মানবিক উন্নয়ন সম্ভব।

৩. আইনসভাকে কার্যকর করে তোলা: সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে আইনসভাকে কার্যকর করে তুলতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় আইনসভার সদস্যরাই নাগরিক মতামতের প্রতিনিধিত্বকারী। আর আইনসভা জাতীয় সমস্যাসমূহ সমাধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও জোরালো ভূমিকা পালন করে আইনসভা। আইনসভাকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার যে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে সেগুলো হলো-

ক. জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে আইনসভার সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেওয়া।
খ. আইনসভার কমিটিগুলোতে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।
গ. আইনসভার বিভিন্ন কমিটিকে গতিশীল করা এবং নির্বাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের এ সব কমিটিতে জবাবদিহিতায় বাধ্য করা।
ঘ. রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য আইনসভায় পৃথক ও স্বাধীন আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা।
ঙ. সুশাসন বিদ্যমান এমন রাষ্ট্রসমূহে আইনসভার সদস্যদের পাঠিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
চ. আইনসভার সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগসহ যথাযথ দাপ্তরিক সুবিধা দেওয়া, যাতে তারা আইন প্রণয়নে ও সংশোধনে দক্ষ হতে পারেন।

৪. শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা: সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে দেশে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ আইন-শৃঙ্খলা (Law and Order) পরিস্থিতি অবশ্য প্রয়োজন। আর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সরকারের। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি রাষ্ট্রকে দুর্বল শাসনের দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্রে নৈরাজ্য, সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রভৃতি দেখা দেয়।

প্রতিটি রাষ্ট্রেই সরকার নিয়ন্ত্রিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকে। সরকার এ সব বাহিনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখে। সরকারের বড় একটি দায়িত্ব হলো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য সরকারকে বাহিনীগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর জন্য উন্নত উপকরণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেও সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে। যে কোনো রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় বিচার বিভাগের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি রাষ্ট্রে সুশাসন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের দক্ষতা অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। স্বাধীন বিচার বিভাগ অপরাধীকে দণ্ড এবং নিরপরাধকে সুরক্ষা দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। নাগরিক স্বাধীনতা ও অধিকার এবং ন্যায়ের মানদণ্ডকে সমুন্নত রাখার জন্য অন্য কোনো বিভাগ বা সংগঠন বিচার বিভাগের বিকল্প হতে পারে না।

৬. কার্যকর আমলাতন্ত্র: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রকে দক্ষ ও কার্যকর করে তোলা অপরিহার্য। যে কোনো রাষ্ট্রের সরকার আমলাতন্ত্র বা জনপ্রশাসনের মাধ্যমেই তার নীতির বাস্তবায়ন করে থাকে। জনপ্রশাসন বলতে সরকারের নির্বাহী বিভাগে কর্মরত বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বোঝায়। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। সরকারের একান্ত কর্তব্য হলো সুশাসনমুখী জনপ্রশাসন গড়ে তোলা।

জনপ্রশাসনে নিযুক্ত কর্মকর্তারা যাতে যথাযথভাবে কর্তব্য পালন করেন তা নিশ্চিত করতে হবে। কার্যকর জনপ্রশাসন গড়ে তোলার জন্য কর্মকর্তা- কর্মচারীদের জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের সুষ্ঠু মূল্যায়নের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও প্রণোদনার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। The British and Irish Ombudsman Association (BIOA) কার্যকর জনপ্রশাসন গড়ে তোলার জন্য ছয়টি নীতির কথা বলেছে। নীতিগুলো হলো-

ক. কর্মের স্বাধীনতা,
খ. উন্মুক্ততা ও স্বচ্ছতা,
গ. জবাবদিহিতা,
ঘ. সততা,
ঙ. উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতা,
চ. কার্যকারিতা।

৭. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা একান্ত প্রয়োজন। সরকার-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহও যেন তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে সজাগ থাকে সে ব্যাপারে সরকার পদক্ষেপ নিতে পারে। নাগরিকদের সহজে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রাপ্তির জন্য সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে থাকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা সরকারের দায়িত্ব।

৮. নাগরিক সেবা বৃদ্ধি করা: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সেবার ক্ষেত্র ও মান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এজন্য মূল ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকেই। সরকারের কর্তব্য হবে গ্রাহক সেবা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এছাড়া নাগরিক সেবা বৃদ্ধির জন্য সরকার আরও যে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে সেগুলো হলো-

ক. গ্রাহক সেবার মান নির্ধারণ।
খ. সরকারি সংস্থা ও অত্যাবশ্যকীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকদের মধ্যে তারা কী মানের সেবা পাচ্ছেন এবং কী মানের সেবা চান, সে ব্যাপারে নিয়মিত জরিপ পরিচালনা করা।
গ. নাগরিক সেবার জন্য যে সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে সেগুলোর ওপর সরকারি নজরদারি বৃদ্ধি করা।

৯. ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠা: ই-গভর্নেন্স প্রক্রিয়া চালুর মাধ্যমেও সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে। ই-গভর্নেন্স হচ্ছে মূলত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি'র (Information and Communication Technology) সাহায্যে সরকারি সেবাদান। এজন্য যোগাযোগের বিভিন্ন পন্থা ও পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার প্রয়োজন। ই-গভর্নেন্স সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে এ ধরনের যোগাযোগকে সহজতর করে।

এতে সরকারের কাজের গতি বৃদ্ধি পায়, তথ্যের অবাধ প্রবাহ সৃষ্টি হয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পায় এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের নাগরিকরা যদি ই-গভর্নেন্স ব্যবহারে দক্ষ না হয়, তবে এর মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে না। তাই নাগরিকদের ই-গভর্নেন্সে দক্ষ করে গড়ে তোলার দায়িত্বও সরকারকে পালন করতে হবে।

১০. শুদ্ধাচারের চর্চা: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সব প্রতিষ্ঠানে যাতে শুদ্ধাচারের চর্চা হয় সে বিষয়টি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। শুদ্ধাচার বলতে সাধারণভাবে নৈতিকতা ও সততার মাধ্যমে প্রভাবিত আচরণগত উৎকর্ষতাকে বোঝায়। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ যদি শুদ্ধাচার চর্চা করে তবে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।

১১. গণমাধ্যম ও বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বক্তব্য প্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্বব্যাংক (World Bank) সুশাসনের যে ছয়টি সূচক চিহ্নিত করে সেগুলোর মধ্যে প্রধান সূচকটিই হলো বক্তব্য প্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা (Voice and Accountability)। বক্তব্য প্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। এজন্য সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হলো বক্তব্য। প্রকাশের মাধ্যমসমূহ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরি ও তা বাস্তবায়ন করা।

১২. স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন: স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠান সুশাসনের জন্য আবশ্যকীয় একটি উপাদান। এ ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের প্রতি নাগরিকের আস্থা সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রেই নির্বাচন পরিচালনার জন্য স্বতন্ত্র সংস্থার অস্তিত্ব রয়েছে।

নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থা কতটুকু স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে তার ওপর নির্ভর করে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা। বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৮নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন আইনগতভাবে একটি স্বাধীন ও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু স্বৈরশাসনের অবসানের পর বাংলাদেশের নির্বাচন আগের তুলনায় গ্রহণযোগ্যতা পেলেও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে সবসময় প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য নেই বললেই চলে। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। আর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠাও সম্ভব নয়।

১৩. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: সুশাসনের অন্যতম শর্ত হলো রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আইন না থাকলে যেমন অনাচার সৃষ্টি হয়, তেমনি আইন না মানলে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। নাগরিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সামাজিক মূল্যবোধ, সাম্য ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের শাসন অত্যাবশ্যক। আইনের শাসনের মাধ্যমে শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। আইনের শাসনের ফলে সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমমর্যাদা পেয়ে থাকে। তাই সরকারকে সবক্ষেত্রে আইনকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং এ অনুযায়ী শাসন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

১৪. সিটিজেন চার্টার প্রণয়ন: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য 'সিটিজেন চার্টার' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সরকারের অন্যতম কর্তব্য। সিটিজেন চার্টার-এর মাধ্যমেই একজন নাগরিক জানতে পারে সে কোন সরকারি অফিস থেকে কী কী সেবা কতদিনে এবং কীভাবে পাবে। সিটিজেন চার্টার সরকার ও নাগরিকের সম্পর্কের মধ্যে নতুন মেলবন্ধন হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

১৫. জনপ্রশাসনের ভূমিকা নিশ্চিত করা: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জনপ্রশাসনের ভূমিকা মুখ্য। এ কারণে জনপ্রশাসনে গতিশীলতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ইত্যাদি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রণোদনা আর্থিকভাবে হতে পারে। আবার সনদ ও পদক বিতরণ ইত্যাদির মাধ্যমেও হতে পারে।

জনপ্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি প্রণোদিত হন তবে সুশাসন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা আরো বেশি কাজ করতে আগ্রহী হবেন। তখন জনপ্রশাসন হয়ে উঠবে নাগরিকদের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের কর্তব্য হলো জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।

১৬. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি নিতে হয়। এর একটি হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। আধুনিক জীবনে অসুস্থতা, বেকারত্ব, বৃদ্ধ বয়সে নির্ভরশীলতা, শিল্প দুর্ঘটনা ও বিকলাঙ্গতার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি যখন স্বীয় ক্ষমতার মাধ্যমে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করতে অক্ষম হন তখন রাষ্ট্রপ্রদত্ত সুরক্ষামূলক যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় সেগুলোই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নাগরিক জীবনে আর্থিক নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। পৃথিবীতে যে সব রাষ্ট্র সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যতবেশি অগ্রসর সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তত বেশি উন্নত। প্রতিটি রাষ্ট্রেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই বলা যায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের করণীয় এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url