ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা কাকে বলে? ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা কাকে বলে? ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর নিয়ে আলোচনা করব।

ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা কাকে বলে? ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর। অথবা, ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী অর্থনীতি কী? এর বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ। অথবা, ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।

ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা কাকে বলে? ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর

ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা: উৎপাদনের উপাদানগুলোর ব্যক্তিগত মালিকানা যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান এবং যেখানে প্রধানত বেসরকারি উদ্যোগে সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থার মাধ্যমে যাবতীয় অর্থনৈতিক কার্যাবলি পরিচালিত হয় তাকে ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা বলে। বিশুদ্ধ ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির ভিত্তি হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Individualism)।

এ রকম অর্থনীতিতে ভোক্তা সাধারণ এবং ব্যক্তিমালিকানার বহুসংখ্যক উৎপাদন প্রতিষ্ঠান উৎপাদন, বণ্টন, ভোগ তথা সমগ্র বাজার কার্যক্রম সম্পর্কে প্রধান সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করে। প্রত্যেক ব্যক্তি উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমগ্র ইউরোপে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির সূত্রপাত ঘটে। ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ ও তাঁর অনুসারিগণ এ ব্যবস্থার দৃঢ় প্রবক্তা।

ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য: ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলোঃ

  1. সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা: ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে সমাজের অধিকাংশ সম্পদ বা উৎপাদনের উপাদানের উপর প্রধানত ব্যক্তিমালিকানা বজায় থাকে। ব্যক্তি তার নিজস্ব সম্পদের অবাধ ভোগদখল ও ক্রয়-বিক্রয়ের স্বাধীনতা ভোগ করে। এজন্য সম্পদের ব্যবহার, উৎপাদনের পরিমাণ ও পদ্ধতি সম্পর্কে ব্যক্তিপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
  2. ব্যক্তিগত উদ্যোগ: ধনতন্ত্রে অধিকাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত হয়। উৎপাদন, বিনিময়, বণ্টন, ভোগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বেসরকারি অংশগ্রহণ বা হস্তক্ষেপ থাকে না বললেই চলে। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সামাজিক চাহিদা পুরণের স্বার্থে উৎপাদন ও বণ্টনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকারি অংশগ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণ থাকে।
  3. অবাধ প্রতিযোগিতা: ধনতন্ত্রে উদ্যোক্তাদের মধ্যে অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সক্ষম ও দক্ষ ব্যবসায়ীরা বাজারে স্থান করে নেয়। প্রতিযোগিতার ফলে নতুন নতুন দ্রব্যের উদ্ভাবন সম্ভব হয় এবং উৎপাদন ব্যয় কমে আবার ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দ্রব্যের দাম নির্ধারিত হয়।
  4. স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থা: ধনতন্ত্রে স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থা মানুষের অর্থনৈতিক কার্যাবলিকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে। স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থা এমন একটি অর্থনৈতিক নিয়ম যেখানে উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রীর দাম দ্রব্যের চাহিদা ও যোগানের পারস্পরিক ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। উৎপাদনকারী কোন কোন দ্রব্য উৎপন্ন করবে তা দ্রব্যের উৎপাদন খরচ এবং দাম দ্বারা নির্ধারিত হয়। ভোক্তা কোন কোন দ্রব্য কিনবে তা সংশ্লিষ্ট দ্রব্যের দামের উপর নির্ভর করে। 
  5. মুনাফা অর্জন: ধনতন্ত্রে সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে উৎপাদন কার্য পরিচালিত হয়। যেসব ক্ষেত্রে বেশি মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা থাকে সেসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ে। ফলে কিছু দ্রব্যের অতি উৎপাদন এবং কিছু দ্রব্যের স্বল্প উৎপাদন হয়।
  6. ভোক্তার স্বাধীনতা: ধনতান্ত্রিক সমাজে ভোক্তার স্বাধীনতা একটি স্বীকৃত বিষয়। প্রত্যেক ভোক্তা তার নিজস্ব পছন্দ, ইচ্ছা ও রুচি অনুযায়ী যে-কোনো দ্রব্য যে-কোনো পরিমাণে এবং যে-কোনো সময় অবাধে ক্রয় ও ভোগ করতে পারে। ভোক্তার চাহিদা বিবেচনা করে উৎপাদনকারী দ্রব্যের উৎপাদন ও যোগান নির্ধারণ করে।
  7. কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অনুপস্থিতি: ধনতন্ত্রে বাজার শক্তির দ্বারা উৎপাদন, ভোগ, বণ্টন তথা সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয়। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত কোন উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বা হস্তক্ষেপ থাকে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার বাজার কার্যক্রমকে সহায়তা দান ও নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা গ্রহণ করে থাকে।
  8. আয় বৈষম্যঃ বিশুদ্ধ ধনতান্ত্রিক সমাজে মুনাফাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে পুঁজিপতিদের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে সমাজে বিত্তবান ও সাধারণ জনগণের মধ্যে আয়ের প্রকট বৈষম্য সৃষ্টি হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুঁজিপতিদের হাতে শ্রমিক শ্রেণি কম-বেশি মাত্রায় শোষিত হয়।
  9. ব্যক্তিগত স্বার্থে উদ্যোগ গ্রহণ: ধনতন্ত্রে পুঁজিপতি ও উৎপাদনকারী কখনও সামাজিক স্বার্থে উৎপাদন করে না। যেসব কারবারে উদ্যোক্তার নিজ স্বার্থ ও মুনাফা সবচেয়ে বেশি হবে, উৎপাদনকারী সেক্ষেত্রেই পুঁজি বিনিয়োগ করবে। বেশি মুনাফার লোভে অনেক সময় কোন দ্রব্যের 'অতি উৎপাদন সংকট' এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের অভাবে নিম্ন উৎপাদন দেখা দেয়।
  10. শ্রমিক শোষণ: বিশুদ্ধ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেণি পুঁজিপতিদের হাতে কম-বেশি মাত্রায় শোষিত হয়। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় একজন শ্রমিকের দ্বারা যতটুকু মূল্য সংযোজন হয় তার চেয়ে তাকে কম মজুরি দেয়া হয়। শ্রমিকের দ্বারা সৃষ্ট এই উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজিপতি আত্মসাৎ করে।
  11. সমাজে শ্রেণিবিভাজনঃ সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার ফলে ধনতন্ত্রে সমাজের মানুষের মধ্যে উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, দরিদ্র প্রভৃতি শ্রেণিবিভাজন সৃষ্টি হয়। এ রকম সমাজে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমশ বিত্তবান হয় এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ ক্রমান্বয়ে দরিদ্র হতে থাকে। ফলে সমাজে শ্রেণিবিভাজন বৃদ্ধি পায়।

সুতরাং উপরালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ব্যক্তি উদ্যোগের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থার দ্বারা উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সমন্বয় ঘটে। কেউ নিঃস্বার্থভাবে নয়, বরং প্রত্যেকে নিজ নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়ে বাজার কার্যক্রমকে সমর্থন দান করে।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা কাকে বলে? ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url