মাছ ও চিংড়ি সংরক্ষণ (প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ)

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে মাছ ও চিংড়ি সংরক্ষণ (প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ) নিয়ে আলোচনা করব।

মাছ ও চিংড়ি সংরক্ষণ (প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ)

মাছ ও চিংড়ি সংরক্ষণ (প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ) Fish and shrimp preservation (Processing, Transportation and Marketing), মাছ ও চিংড়ি আহরণের পর দীর্ঘ সময় আহারোপযোগী রাখার জন্য সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয়। মাছ ও চিংড়ির গুণগতমান প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অক্ষুণ্ণ রেখে সংরক্ষণ করার অনেক প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে।

মাছ ও চিংড়ি মৃত্যুর পর হতে স্বাভাবিক গঠন, স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ ইত্যাদির ব্যাপক অবনতি ঘটতে থাকে, যা হলো পচনক্রিয়া। মাছে যথেষ্ট আমিষ আছে, যা দ্রুত পচনের জন্য সহায়ক। মাছ ও চিংড়ির মৃত্যুর পর পেশি নরম ও নমনীয় হয়ে যায় এবং তাদেরকে বাঁকানো যায়। কিন্তু কিছু সময় পর হতে মাছ ও চিংড়ির পেশি শক্ত ও কঠিন হতে শুরু করে এবং শক্ত হয়ে যায়।

পরিবেশের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার উপর নির্ভর করে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত মাছের শক্তাবস্থা টিকে থাকে। শক্তাবস্থায় টিপ দিলে পুনরায় পেশি দেবে যাওয়ার পর আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। তবে মাছের বা চিংড়ির মৃত্যুর পর দেহের জটিল রাসায়নিক পর্যায়ক্রমিক যে পরিবর্তন হতে থাকে সে প্রক্রিয়াকে রাইগর মরটিস বলে। রাইগর মরটিস অবস্থা মাছের সজীবতা প্রকাশ করে। এ অবস্থা বিলুপ্তির পর হতে মাছ পচা শুরু করে।

মাছ আহরণের পর হতে ভোক্তার নিকট পৌঁছানো ও ভোক্তা কর্তৃক ব্যবহার পর্যন্ত পরিবহন, পরিচর্যা ও সংরক্ষণের কার্যাদি সর্তকতার সাথে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। তবে মাছ আহরণ পরবর্তী গুণগতমান বজায় রেখে সংরক্ষণ করার জন্য যে সমস্ত কাজ করা হয় তাকে প্রক্রিয়াজাতকরণ বলা হয়।

মাছ পচনের প্রভাব ও কারণ

যে সমস্ত কারণ মাছকে পচনের জন্য প্রভাবিত করে তা হলো-
  1. অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মৃত মাছ স্তূপ করে রাখা।
  2. আহরণোত্তর অবস্থায় রোদে/খোলামেলা পরিবেশে জমা করে রাখা।
  3. মাছকে নিম্ন তাপমাত্রায় রাখার জন্য ছায়ায় না রাখা ও বরফ ব্যবহার না করা।
  4. মাছ নোংরা ও দূষিত পানি দিয়ে ধোয়া।
  5. কম বরফ ব্যবহার করা বা পরিবহনে বরফ ভ্যান ব্যবহার না করা এবং পরিবহন যান অপরিষ্কার, ময়লাযুক্ত হওয়া।
  6. মাছ পরিবহন যানে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগা বা মাছে চাপা লেগে নাড়িভুঁড়ি বের হওয়া ইত্যাদি।

সাধারণত নিম্নলিখিত তিনটি কারণে মাছ পচে। যেমন-

১. পাচক রসের কার্যকলাপে দেহ কোষ ভেঙে যাওয়া, ২. অণুজীব/ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, ৩. বাতাসের O₂ দ্বারা চর্বি ভেঙে দুর্গন্ধ সৃষ্টি। তবে মাছের পচনের এসব কারণকে দু'ভাবে চিহ্নিত করা যায়। যথা- ১. রাসায়নিক ক্রিয়ায় ও ২. ব্যাকটেরিয়ার কারণে।

১. রাসায়নিক ক্রিয়ায় পচন: রাসায়নিক ক্রিয়ায় পচন আবার দু'ভাবে হয়ে থাকে। (ক) দৈহিক এনজাইমের ক্রিয়ায় ও (খ) র‍্যানসিডিটি। ক. দৈহিক বিভিন্ন এনজাইম মাছের জীবিত অবস্থায় বিপাকীয় কাজে লাগে এবং মাছ মারা যাওয়ার পর প্রোটিন, চর্বি, ও কার্বোহাইড্রেটের ব্যাপক ভাঙন ঘটায়, ফলে পচন শুরু হয়। অর্থাৎ মাছ মরে গেলেও এনজাইম নিঃসরণ হতে থাকে। এটা স্বয়ংক্রিয় পচন। খ. র‍্যানসিডিটি পচন চর্বিযুক্ত মাছের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। এতে মাছের পেট ফেটে জলীয় পদার্থ নিঃসৃত হতে থাকে।

২. ব্যাকটেরিয়াজনিত পচন: মাছের ফুলকা, অস্ত্র ও ত্বকীয় শ্লেষ্মায় প্রচুর ব্যাকটেরিয়া থাকে। তবে মাছের পেশিতে থাকে না। আহরণের সময় এবং মাছের মৃত্যুর পর মাছের দেহের বিভিন্ন অংশে ব্যাকটেরিয়া আশ্রয় নেয়। এরাই মাছকে ক্ষতিগ্রস্ত করে খাদ্যের সম্পূর্ণ অনুপযোগী করে তোলে। ব্যাকটেরিয়া জীবন্ত মাছের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু মাছ মারা যাওয়ার পর ব্যাকটেরিয়া মাছের শরীরের পানির সংস্পর্শে এসে অতি দ্রুত বংশ বৃদ্ধি ঘটায় এবং পচন শুরু করে। মাছের শরীরের ৭০-৮০% পানি। মাছ ও চিংড়িকে তাই পচন হতে রক্ষা করতে হলে দুটি বিষয়ের প্রতি প্রাথমিকভাবে সতর্ক হতে হবে। যেমন- সময় ও তাপমাত্রা।

মাছ সংরক্ষণের মূলনীতি

মাছ সংরক্ষণের মূলনীতি হচ্ছে-
১. পরিচ্ছন্নতামূলক ব্যবস্থা, ২. ব্যাকটেরিয়ার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কার্যকলাপ রহিতকরণ ব্যবস্থা এবং ৩. ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ।
  1. পরিচ্ছন্নতামূলক ব্যবস্থা: মাছ ও চিংড়িকে উত্তমরূপে পরিষ্কার পানি দিয়ে তাড়াতাড়ি ধৌতকরণ, ফুলকা ও অস্ত্র অপসারণের ব্যবস্থা করে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ হ্রাস করা।
  2. ব্যাকটেরিয়ার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কার্যকলাপ রহিতকরণ ব্যবস্থা: এ ব্যবস্থায় নিম্ন তাপ, আর্দ্রতা অপসারণ ও সংরক্ষণ দ্রব্য ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপ থামিয়ে দেওয়া হয়। তবে নিম্ন তাপের মধ্যে হিমায়িতকরণ ও শীতলীকরণ, আর্দ্রতা অপসারণের মধ্যে লবণায়ন, শুষ্ককরণ বা শুঁটকিকরণ, ধূমায়িতকরণ ও নিরুদিকরণ করা হয়। আর সংরক্ষক দ্রব্যের মধ্যে ভিনেগার, ফরমালিন, পলিফেনল ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।
  3. ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ: এ ব্যবস্থায় উচ্চ তাপমাত্রায় বায়ুরোধক পাত্রে মাছ ও চিংড়ি সংরক্ষণ করা হয়। এতে নতুন করে কোনো প্রকার ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের সুযোগ পায় না। তবে মাছের স্বাদে কিছুটা পরিবর্তন হলেও গুণাগুণ ঠিক থাকে।
মাছ ও চিংড়ি আহরণ করেই নিকটবর্তী ছায়াযুক্ত, খোলামেলা এবং পাকা বা কাঠের মেঝেতে রাখতে হবে। যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর ট্যাঙ্ক বা ড্রামে গুঁড়া বরফ মিশ্রিত পানিতে রাখতে হবে। অতঃপর পৃথক পৃথক ট্রেতে এক স্তর বরফ ও এক স্তর মাছ-চিংড়ি সাজিয়ে তাপ নিরোধক ভ্যানে বা গাড়িতে বাক্স/ট্রেগুলো সাজাতে হবে।

বাক্সে বা ট্রেতে বরফ সাজানোর সময় ১ : ১ অনুপাতে বরফ ও মাছ নিতে হবে। মাছ/চিংড়ি সাধারণত কর্কসীট নির্মিত বাক্স বা বাঁশের পাতলা চটা বা হুগলা পাতা দিয়ে তৈরি ঝুড়িতে পরিবহন করা হয়ে থাকে। পরিবহন সময় যত দীর্ঘ হবে মাছ ও চিংড়ির গুণগত মান তত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সুতরাং দ্রুত পরিবহন ও বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে।

চিংড়ি পরিবহনের কাজে প্রযোজ্য শর্তাবলি: মৎস্য ও মৎস্য পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ১৯৯৭ (সংশোধিত জুন-২০০৮) এর বিধি ৬ ও ১৫ (১) এর সংশ্লিষ্ট তফসিল ৫-এ মৎস্য পরিবহন কাজে ব্যবহৃত গানের জন্য প্রযোজ্য শর্তাবলি হচ্ছে-

  1. মাছ পরিবহন কাজে ব্যবহৃত যানে রোদ, বৃষ্টি এবং বিভিন্ন সংক্রমণ হতে মাছকে রক্ষা করার সুবিধাদি থাকতে হবে।
  2. পরিবহন যানের ফিস হোল্ডারের সকল দেয়াল পানি নিরোধক ও তাপ অপরিবাহী হতে হবে।
  3. পরিবহন যানে এমনভাবে মাছ সংরক্ষণ করতে হবে, যেন থেঁতলে না যায়।
  4. পরিবহনকালে তাজা মাছ বরফকৃত করে ৫° সে. এর নিম্ন তাপমাত্রায় শীতলকৃত অবস্থায় রাখতে হবে।
  5. রেফ্রিজারেটেড ক্যারিয়ারে তাজা মাছ পরিবহনকালে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এরূপ হতে হবে যাতে মাছের তাপামাত্রা ১৮° সে. হতে ২° সে. এর মধ্যে উঠানামা করে।
  6. মাছ পরিবহন যানে রক্ষিত বাক্স, ব্যারেল বা ডেক-হোল্ড, পেন বোর্ড, শেলফ-বোর্ড পরিষ্কার ও সংক্রামণমুক্ত রাখতে হবে।

বাজারজাতকরণ (Marketing)

মাছ ও চিংড়ি আকার ও গুণগতমান অনুযায়ী বিপননকালে বিভিন্ন প্রকার পাত্রে বরফ স্তর সাজিয়ে দিয়ে নিতে হয়। যে অবস্থাতেই যতটুকু সময়ই রাখা হউক না কেন মাছ/চিংড়ি ছায়াযুক্ত স্থানে রাখা উচিত। পরিবহনের জন্য পাত্রের তলায় এক স্তর বরফ দিয়ে মাছ/চিংড়ি সাজাতে হয়। আর সাজানোর সময় খেয়াল রাখতে হয় মাছ/চিংড়ির স্তর যেন ৪৫/৬০ সে.মি. এর বেশি উঁচু না হয়। কেননা তাতে দৈহিক আকৃতিগত ক্ষতি হতে পারে।

ফ্লোচার্ট: নিরাপদভাবে মাছ/চিংড়ি সংগ্রহ নিরাপদ পরিবেশে অবতরণ ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণ নিরাপদ পরিবহন বিপণন। মাছ বা চিংড়ি আহরিত স্থান হতে অধিকাংশ সময়েই সরাসরি আড়তে নিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চটের ছালা বা হুগলার চাটাই দিয়ে বরফের অনুপাত ঠিক না রেখেই প্যাকিং করা হয়। এতে ময়লা ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দ্বারা মাছ/চিংড়ি আক্রান্ত হয়। এ অবস্থার উন্নয়ন সহজেই করা সম্ভব। তবে ইতোমধ্যে কিছুকিছু বরফযুক্ত তাপ কুপরিবাহী ভ্যান চালু হয়েছে।

চিংড়ি বাজারজাতকরণের জন্য একই আকারের শক্ত খোলসবিশিষ্ট, পরজীবীমুক্ত এবং অক্ষত অবস্থায় প্যাকিং করা উচিত। খোলস পাল্টানো চিংড়ি, যা নরম অবস্থায় থাকে তা আহরণ ও বাজারজাত করা মোটেই উচিত নয়। মাছের ক্ষেত্রে ফুলকা স্বাভাবিক ও স্বচ্ছ, চোখ উজ্জ্বল বর্ণ, শরীরে কোনো দাগ থাকে না এবং লেজ ও ফিনগুলো পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে ও ফুলের ন্যায় ছড়িয়ে থাকে তা দেখে প্যাকিং করা উচিত। ভালো অবস্থায় রাখার জন্য পরিবহন দূরত্বের ওপর নির্ভর করে সাধারণত মাছ ও চিংড়ির বরফের অনুপাত হিসাব করে ব্যবহার করতে হয়।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। মাছ ও চিংড়ি সংরক্ষণ (প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ) এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url