লবণ ক্ষেতে বাগদা চিংড়ি চাষ

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে লবণ ক্ষেতে বাগদা চিংড়ি চাষ নিয়ে আলোচনা করব।

লবণ ক্ষেতে বাগদা চিংড়ি চাষ

লবণ ক্ষেতে বাগদা চিংড়ি চাষ (Culture of giant tiger prawn in salt field) - উপকূলীয় এলাকার মানুষের কাছে বাগদা চিংড়ি 'বাথারাইছা' বা 'কালাইচ্ছা' নামে পরিচিত। চিংড়ি জলাশয়ের পানিতে জন্মানো নুনিয়া বনের মধ্যে বিচরণ করতে বেশি পছন্দ করে। বাগদা চিংড়ি জালের পাতনের সাথে আঘাত খেয়ে সামনের দিকে অথবা আশে পাশে ৪-৫ টা লাফ দিয়ে চলে যায়। ছোট ছোট খাল, জলাশয়, লবণের মাঠ, ধানী জমি ও পরিত্যক্ত অনাবাদি ঘাসি জমিতে বাঁধ দিয়ে লোনা পানি ঢুকিয়ে এককভাবে চিংড়ি চাষ করা হয়।

উপকূলীয় এলাকার বিশেষ করে কক্সবাজার এলাকার একই জমিতে পর্যায়ক্রমে লবণ ও চিংড়ি চাষ করা হয়। শীত মৌসুমে লবণ উৎপাদনের পর ঐ জমিতে পুনরায় চিংড়ি চাষ করা হয়। এতে জমি প্রায় সারা বছর আবাদের আওতায় থাকে এবং চাষীরা সারা বছর কাজে ব্যস্ত থাকে। ফলে চাষীরা আর্থিকভাবে লাভবান হয়। বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় ২০০৬-০৭ সালে ৭০,৭৫৪ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করা হয়। কিন্তু ২০০৯-১০ সালে ৬৭,৭৫২ একর জমিতে লবণ চাষ হয়। চাষীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫,০০০ জন।

আবহাওয়া শান্ত ও অনুকূলে থাকে বলে ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লবণ উৎপাদনের জন্য জমির আইল ঠিক করে ও জমি সমতল করে প্রস্তুত করা হয়। আবহাওয়ায় কোনো ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থা বিরাজ করলে জমি প্রস্তুতে কিছুটা সময় পরিবর্তন হতে পারে।

সাধারণত বেড়ি বাঁধের মধ্যে চিংড়ি ও লবণ চাষ করা হয়। চিংড়ি ও লবণ চাষের জমিকে প্রথমত ৬-৭ টি বঙে বা প্রকোষ্ঠে ভাগ করা হয়। প্রকোষ্ঠগুলোর নির্দিষ্ট আকার সব সময় দেওয়া যায় না। তবে সচরাচর প্রত্যেকটি প্রকোষ্ঠ সমান আয়তন করার চেষ্টা করা হয়। উপকূলীয় লবণযুক্ত পানির জমি অনেক সময় কাত, আঁকাবাঁকা বা লম্বাটে হয়ে থাকে। তাই প্রকোষ্ঠগুলো করার সময় অবস্থানগত কারণে ছোট বা বড় হতে পারে।

প্রতিটি প্রকোষ্ঠের চারদিকে ১১.৫ ফুট উঁচু করে বাঁধ দিয়ে প্রতিটি প্রকোষ্ঠকে স্বতন্ত্র করা হয়। তবে প্রকোষ্ঠগুলোর একদিকে চিকন ও ছোট নালা করে একটি প্রকোষ্ঠের সাথে অনা প্রকোষ্ঠের সংযোগ রাখা হয়। লবণ চাষের জন্য প্রতিটি প্রকোষ্ঠের তলার জমি রোলারের সাহায্যে সমতল ও শক্ত করা হয়। জমিতে প্রকোষ্ঠগুলোয় আইল শক্তভাবে নির্মাণ করা হলে সরবরাহ খাল/নালা দিয়ে জলাধারে লোনা পানি প্রবেশ করায়ে কয়েকদিন রাখা হয়।

তারপর জলাধার থেকে লোনা পানি প্রথমে একটি প্রকোষ্ঠে ঢুকায়ে আটকে দেওয়া হয়। এ পানি ১৫-২০ দিন রোদে শুকিয়ে পানি বাষ্পীয়করণ করার পর ছোট নালা দিয়ে দ্বিতীয় প্রকোষ্ঠে লবণ পানি। প্রবেশ করানো হয়। এভাবে এক একটি প্রকোষ্ঠের পানি বাষ্পীভূত করে পর্যায়ক্রমে শেষ বা সপ্তন প্রকোষ্ঠে আনা হয়। এ প্রকোষ্ঠগুলোতেই লোনা পানি ১ ২ সপ্তাহ আটকে বাষ্পীভূত করার ফলে প্রকোষ্ঠগুলোতে লবণ দানা বাঁধে।

এভাবে শেষ ঘেরে লবণ দানা বাঁধা শুরু হলে প্রথম প্রকোষ্ঠ/ঘের দিয়ে পুনরায় পানি প্রবেশ করে শেষ ঘের/প্রকোষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছানো হয়। এরপর নতুন পানি বাষ্পীভূত হয়ে পুনরায় লবণের স্তর তৈরি হয় এবং চূড়ান্তভাবে লবণ সংগ্রহ উপযোগী হয়। তবে, উপকূলীয় এলাকায় জমিতে লবণ ও চিংড়ি চাষে ফসল পরিক্রমায় দো'ফসলী হিসেবে ধরা হয়।

চিংড়ি চাষের পর লবণ আর চিংড়ি এভাবেই উপকূলীয় জমিতে চাষ করা হয়ে থাকে। লবণের জমিতে অতিমাত্রায় লবণাক্ত থাকায় অন্য মৌসুমে চিংড়ি ছাড়া অন্য কোনো ফসল করা যায় না। লবণ চাষ ঘেরের/বেড়ি বাঁধের ভিতরে করা হয় বলে পানি নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা রাখা যায়। অগ্রহায়ণ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত এ ৬ মাস লবণ চাষ করা হয়।

এরপর লবণের জমিতে পানি প্রবেশ করায়ে চিংড়ি চাষ করা হয়। তবে ব্যবহারভিত্তিক লবণ ৩ ধরনের হয়। যথা- সাদা, হালকা সাদা (মাঠ ওয়াশ) ও কাসা মিশ্রিত লবণ। এর ব্যবহারের প্রকারভেদও ৩ ধরনের। যথা- ভোজ্য: হাঁস-মুরগি, মৎস্য ও গবাদিপশুর খাদ্যের এবং শিল্পের কাঁচামাল।

চিংড়ি চাষে সফলতার জন্য চাষ ব্যবস্থাপনার যেসব বিষয়গুলো প্রভাব বিস্তার করে তা হলো-

  1. চিংড়ি চাষে খামারের জমির চারপাশে ৩-৪ ফুট উঁচু করে বাঁধ দিতে হয়, যাতে জোয়ার, বৃষ্টি বা কোনোভাবে পানি প্রবেশ করতে না পারে।
  2. ভাইরাস মুক্ত, সুস্থ ও সবল পোনা প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা।
  3. সামুদ্রিক জলজপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদের বিরাট অংশ হচ্ছে চিংড়ি। তাই সমুদ্র সম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরের মিণ্ডল গ্রাউন্ড ও সাউথ প্যাচেস এর নিকটবর্তী ৬৯৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা, যা সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষিত হয়েছে, তা যথাযথ রক্ষা করা।
  4. চিংড়ি চাষকৃত খামারে পানির গভীরতা ১-১.২ মিটারের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা।
  5. পানির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য নার্সারিতে প্রতিপালিত ১.০-১.৫ সে.মি. সাইজের গলদা চিংড়ির পোনা ছাড়া উচিত।
  6. প্রখর রোদ বা বৃষ্টির সময় খামারে পোনা ছাড়া উচিত নয়।
  7. চিংড়ি চাষ ব্যবস্থাপনায় খামারে সরবরাহকৃত পানির উৎস অবশ্যই দূষণমুক্ত হতে হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের যেখানে ২-৩ মিটার উচ্চতায় জোয়ার-ভাটা হয় সেখানেই খামার করা উচিত।
  8. চিংড়ির খামারের পাশে যেখানে গভীর নলকূপ, অগভীর নলকূপ বা হস্তচালিত নলকূপ আছে সেসব স্থান বেশ উপযোগী। তবে বাগদা চিংড়ির জন্য লোনা পানির উপকূলীয় এলাকা নির্বাচন করা বাঞ্ছনীয়।
  9. মাটির pH মান ৫.০-৬.৫ হলে চিংড়ি চাষের বেশি অনুকূল। তবে pH মান ৫.০ এর কম হলে সেখানে চিংড়ি চাষ করা অনুচিত। চিংড়ি চাষের জন্য জমির উপরিভাগ সমান বা সামান্য ঢাল হলে উত্তম।
  10. পানির গুণাগুণ বলতে পানির ভৌত রাসায়নিক ও অণুজৈবিক বিষয়গুলোকে বুঝায়। পানি ঘোলা ও ভারী কাদাযুক্ত স্থানে চিংড়ি চাষ করা অনুচিত।
  11. চিংড়ির প্রাকৃতিক খাদ্য তথা উদ্ভিজ্ঞ ও প্রাণিজ খাদ্য পানিতে থাকা অপরিহার্য। নিয়ন্ত্রিত জলাশয়ে চুন, জৈব ও অজৈব সার প্রয়োগ করে প্রাকৃতিক খাদ্য অর্থাৎ প্ল্যাঙ্কটন বাড়ানো যায়। এছাড়াও মাটিতে এক প্রকার ক্ষুদ্র পোকামাকড় এবং কেঁচো জাতীয় প্রাণী উৎপন্ন হয়। এদেরকে বলা হয় বেনথোজ।
  12. পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য পানিতে পাওয়া না গেলে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হয়। খামারে দিনে দু'বার অর্থাৎ সূর্যোদয়ের পর এবং সূর্যাস্তের সময় খাবার দিতে হয়। পোনার ওজনের ৩-৫% হারে খাবার দেওয়া উত্তম। সন্ধ্যার সময় সব চিংড়ি পাড়ের কাছাকাছি খাদ্যের জন্য আসে। এজন্য খাদ্য পিলেটসমূহ পুকুরের চারদিকে পাড়ের কাছাকাছি স্থানে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হয়।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। লবণ ক্ষেতে বাগদা চিংড়ি চাষ এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url