পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের প্রয়োজনীয়তা

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করব।

পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের প্রয়োজনীয়তা - Importance of the Study of Civics and Good Governance

পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়ন এবং অনুশীলনের গুরুত্ব অপরিসীম। যা কিছু নাগরিক জীবনকে স্পর্শ করে এবং নাগরিকতা বিষয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়, তার প্রায় সব কিছু নিয়েই পৌরনীতি ও সুশাসনে আলোচনা করা হয়। আর তাই নাগরিকের অধিকার, কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে এবং সমাজ, রাষ্ট্র ও অন্যান্য মানবীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের গুরত্ব অপরিসীম। এ বিষয়টি অধ্যয়নের গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো: 

১. সুনাগরিক হওয়ার শিক্ষাদান: বর্তমান বিশ্বের সর্বত্রই গণতন্ত্র সবচেয়ে পছন্দনীয় সরকার ব্যবস্থা। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে নাগরিকের কর্মকাণ্ডের ওপর। কেননা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক সম্পর্ক অধিকার ও কর্তব্য দ্বারা নির্ধারিত। এ অধিকার ও কর্তব্য পালনে নাগরিককে হতে হবে সুনাগরিক। সুনাগরিকতা অর্জনের তিনটি অপরিহার্য গুণ হচ্ছে আত্মসংযম, বুদ্ধি ও বিবেকবোধ। পৌরনীতি ও সুশাসনের পাঠ নাগরিককে এ তিন গুণ লাভ করতে সহায়তা করে। একজন নাগরিকের মধ্যে এ গুণগুলির পরিপূর্ণ সমন্বয় ঘটলেই কেবল সে দেশ ও জাতি সম্পর্কে সচেতনতা অর্জনে সক্ষম হবে।

২. নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি উদার করে: পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ করে নাগরিকরা দায়িত্বশীল, কর্তব্যনিষ্ঠ, স্বচ্ছ ও উদার মানসিকতাসম্পন্ন হয়। তাদের মধ্যকার গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা, অন্ধবিশ্বাস, সংকীর্ণতা, কুসংস্কার প্রভৃতি দূর হয়। অর্থাৎ পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠে নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি উদার হয়। এছাড়া দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়ণতা অর্জনের মাধ্যমে নাগরিকরা উপযুক্ত মানবসম্পদে পরিণত হয়।

৩. গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন: রাষ্ট্রীয় সংগঠনের মৌলিক প্রতিষ্ঠানসমূহ (পরিবার, সমাজ, সরকার, সংবিধান, রাজনৈতিক দল ইত্যাদি) পৌরনীতি ও সুশাসনের প্রধান আলোচ্য বিষয়। কাজেই এ বিষয়টি পাঠের মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠন কাঠামো, কার্যাবলি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে পারে।

৪. সুশাসন সম্পর্কে ধারণা লাভ: বর্তমানে পৌরনীতির ধারণার সাথে সুশাসন বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় রাষ্ট্রব্যবস্থায় নতুন চিন্তাভাবনার উদয় হয়েছে। একটি রাষ্ট্র যদি সুশাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত না হয় তাহলে সে রাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার সুষম বণ্টন, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক দুর্নীতি হ্রাস, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, কার্যকর আইনসভা, জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয় সুশাসনের জন্য অপরিহার্য। পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয় পাঠের মাধ্যমে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করা সম্ভব।

৫. সুষ্ঠু সমাজ গঠনে সহায়ক: মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক রীতিনীতি মেনে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে জীবন পরিচালনা করা মানুষের কর্তব্য। এজন্য মানুষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টি করেছে। আর এ রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হলো সামাজিক শৃঙ্খলা এবং নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক। পৌরনীতি ও সুশাসনের পাঠ গ্রহণের মাধ্যমে নাগরিকরা সুষ্ঠু ও সুসম্পর্কপূর্ণ একটি সমাজ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়।

৬. নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে শিক্ষাদান: একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর সেই রাষ্ট্রের মানবিক দিকটি ফুটে ওঠে। পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনার মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে পারে। ৭

৭. কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক: আধুনিক রাষ্ট্র মূলত জনকল্যাণমূলক। যুগের বিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্র তথা সরকারের কাজের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। আর এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য জনগণকে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সাথে পরিচিত হতে হয়। পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ নাগরিকদের এ কাজে সহায়তা করতে পারে।

৮. রাষ্ট্র ও সরকারের নানা দিক সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: পৌরনীতি ও সুশাসন রাষ্ট্র ও সরকারের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করে। এটা রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বিকাশ, রাষ্ট্রীয় সংগঠনের গঠন কাঠামো ও রাষ্ট্রের কার্যাবলী সম্পর্কে জ্ঞান দান করে। এ বিষয় পাঠ করে সরকার, এর শ্রেণিবিভাগ, সরকারের বিভিন্ন রূপ, বৈশিষ্ট্য, দোষ, গুণ, সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন, সংবিধান, এর প্রকারভেদ, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা যায়। সুনাগরিক হওয়ার জন্য এ সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা অত্যাবশ্যক।

৯. রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: রাজনৈতিক উন্নয়নের ধারণা থেকে নাগরিক উন্নত-অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। পৌরনীতি ও সুশাসন এ সম্পর্কে ধারণা প্রদান করে। উন্নয়নের বিভিন্ন ধারা ও পদ্ধতি সম্পর্কে এ শাস্ত্র বিস্তারিত আলোচনা করে। আর রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে উন্নয়ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে হলে উন্নয়নের ধারা ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন অপরিহার্য।

১০. সুযোগ্য নেতৃত্ব গঠনে উদ্বুদ্ধকরণ: একটি দেশকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন। জাতিকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে হলে নেতার অবশ্যই পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ে যথাযথ ধারণা থাকতে হবে। নেতৃত্ব কী, কীভাবে নেতৃত্ব লাভ করা যায়, এর আবশ্যকীয় গুণাবলি কী কী, এটি অর্জনের ক্ষেত্রে সমস্যা ও এর সমাধানের উপায় সবকিছু নিয়ে পৌরনীতি ও সুশাসন আলোচনা করে।

১১. জাতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন: পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকদের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে পরিচিত করে। এভাবে জাতীয় চেতনা জাগ্রত করার মাধ্যমে নাগরিকদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। এভাবে পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ জাতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

পরিশেষে বলা যায়, সুনাগরিকতার শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সফল ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন গড়ে তুলতে হলে পৌরনীতি ও সুশাসনের জ্ঞান লাভের বিকল্প নেই। আবার আইন, স্বাধীনতা, সাম্য, নৈতিকতা, সমাজ, পরিবার, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ অত্যাবশ্যক।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের প্রয়োজনীয়তা এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url