পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যবেক্ষণ

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করব।

পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যবেক্ষণ

পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যবেক্ষণ (Natural Food Observation in Pond) পুকুরের পানির হালকা সবুজ, বাদামি সবুজ বা হালকা বাদামি রং মাছ চাষের জন্য ভালো। প্রাকৃতিক খাদ্য দুই ধরনের। যথা- ক. উদ্ভিদ জাতীয়: অতি ক্ষুদ্র শেওলা (ফাইটোপ্লাঙ্কটন), খ. প্রাণী জাতীয়: ছোট ছোট জলজ কীট ও পোকা (জুপ্ল্যাঙ্কটন)।

পুকুরে পোনা মজুদের আগে অর্থাৎ সার প্রয়োগ করার ৩-৫ দিন পর খাদ্য তৈরি হয়েছে কি-না তা পর্যবেক্ষণ করে নিতে হবে। প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা করার কতকগুলো পদ্ধতি আছে। নিচে কয়েকটি পদ্ধতি উল্লেখ কর হলো-

পরীক্ষা পদ্ধতি-১: পুকুরের পানিতে সোজাভাবে হাত ডুবিয়ে হাতের তালু লক্ষ করতে হবে। যদি কনুই পর্যন্ত ডুবানোর আগেই হাতের তালু/পাতা দেখা না যায়, তাহলে বুঝতে হবে যে পানিতে অতিরিক্ত খাদ্য আছে এবং কনুই পর্যন্ত ডুবানোর পর হাতের তালু/পাতা দেখা গেলে বুঝতে হবে যে খাদ্য কম আছে।

পরীক্ষা পদ্ধতি-২: সেক্কিডিস্ক দ্বারা পরীক্ষা। সেক্কিডিস্ক হলো ক্রস চিহ্ন করে সাদা কালো রং করা লোহার বা ধাতব পদার্থের তৈরি একটি গোলাকার থালা বা চাকতি, যার কেন্দ্রে তিন রং বিশিষ্ট একটি সুতা/রশি লাগানো থাকে, যাতে ঝুলিয়ে রাখা যায়।

থালার গোড়া থেকে রশির প্রথম অংশের রং লাল (২০ সেমি.), দ্বিতীয় অংশের রং সবুজ (১০ সেমি.) এবং হাতে ধরার সর্বশেষ অংশের রং সাদা (২২.৫-২৫ সেমি.)। পরীক্ষা করার সময় সূর্যের আলোর দিকে মুখ করে সেভিডিস্ক পানিতে ডুবাতে হবে।

সুতা ধরে ডিস্কটি আস্তে আস্তে পানিতে ছেড়ে দিয়ে একটু উঠালে বা ডুবালে সাদা রং দেখা যায় এমন গভীরতায় ডিস্কটি স্থির করে ধরে রাখতে। হবে। এ সময় লাল অংশ পানির উপরে থাকলে বুঝতে হবে যে পুকুরে।

অতিরিক্ত খাদ্য আছে। এছাড়া ডিস্ক ডুবিয়ে সাদা অংশ পানির উপরে থাকলে বুঝতে হবে যে পুকুরে খাদ্য কম আছে এবং সবুজ অংশ পানির উপরে থাকলে বুঝতে হবে যে পুকুরে পরিমিত খাদ্য আছে।

পরীক্ষা পদ্ধতি-৩: প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যাপ্ত আছে কি-না তা সেঞ্চিতিস্ক দ্বারা পরীক্ষা করে জেনে নিতে হবে। সেক্কিডিস্ক পানিতে ৩০-৩৫ সেমি, ডুবানোর পর দেখা না গেলে বুঝতে হবে যে পানিতে প্রয়োজনীয় খাবার আছে।

যদি ২০ সেমি. ডুবানোর পরই দেখা না যায় তাহলে বুঝতে হবে অতিরিক্ত মাত্রায় খাবার আছে এবং এ সময় খাবার দেওয়া বন্ধ রাখতে হবে। আবার ৫-৭ দিন পর পর গ্লাসে পানি নিয়ে সূর্যের দিকে ধরলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণিকণা দেখা গেলে বুঝতে হবে পর্যাপ্ত খাবার আছে।

সেক্কিডিস্ক সাধারণত সকাল ১১.০০ টায় ডুবানো উচিত। তবে ৩৫ সেমি. পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা গেলে খাবার বাড়িয়ে দিতে হয়। জলাশয়ে চাহিদার তুলনায় খাদ্য ও সার বেশি দেওয়া হলে পানির গুণাগুণ নষ্ট হতে পারে। তাই পানির গুণাগুণ ঠিক রাখতে হলে বিঘা প্রতি ২০ কেজি কলিচুন গুলিয়ে ঠাণ্ডা করে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে।

পরীক্ষা পদ্ধতি-৪: পুকুরে সার প্রয়োগের ৫-৭ দিন পর ঘন গামছার সাহায্যে পুকুরের (২-৩ ফুট/৫-৭ সেমি, জায়গার) পানি ছেঁকে গামছার মধ্য থেকে কিছু পরিমাণ পানি একটি পরিষ্কার কাঁচের গ্লাসে নিতে হবে। সূর্যের আলোতে যদি গ্লাসের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণিকণা (গ্লাস প্রতি ৫-১০টি) দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে যে প্রাকৃতিক খাদ্য আছে। রঙিন, ছাপ দেওয়া, অস্বচ্ছ গ্লাস অথবা ঘোলা পানিতে এ পরীক্ষা সঠিক হবে না।

প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা করার সময় সতর্কতা: ঘোলা পানিতে ও মেঘলা দিনে সঠিক ফলাফল পাওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য অতিরিক্ত থাকলে সার বা সম্পূরক খাদ্য ব্যবহার করা ঠিক হবে না। আবার কম থাকলে সার বাড়িয়ে দিতে হবে এবং পর্যাপ্ত থাকলে রেনু পোনা ছাড়া যাবে তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে ও সার প্রয়োগ করতে হবে।

পোনা মজুদের জন্য পানির উপযুক্ততা পরীক্ষা: পানির উপযুক্ততা পরীক্ষার জন্য পুকুরের পানিতে একটি হাপা (মশারিকে উল্টো করে ধরলে যেমন দেখা যায়) স্থাপন করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে হাপার তলদেশ যেন পুকুরের তলা/কাদা স্পর্শ না করে।

এরপর হাপার ভিতরে ১৫০-২০০টি ধানী পোনা ২৪-৪৮ ঘণ্টা রাখার পর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি সবগুলো ধানী পোনা বেঁচে থাকে বা ১০-২০% পোনা মারা গেছে, তাহলে বুঝতে হবে যে পুকুরের পানি মাছ চাষের জন্য উপযোগী আছে।

সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ: জলাশয়ে খাদ্য কম হলে সম্পূরক খাদ্য দিতে হবে। অন্যথা মাছের বৃদ্ধি কমে যাবে। সাধারণত পোনা ছাড়ার ২য় দিনে ১ ভাগ সরিষার খৈল এবং ৩ ভাগ চাউলের কুঁড়া/গমের ভুসি একত্রে মিশিয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে। সম্ভব হলে এর সাথে গবাদিপশুর রক্ত শতকরা ২০ ভাগ মিশিয়ে দিলে নাইলোটিকা বৃদ্ধি দ্রুত হয়।

আগাছা নিয়ন্ত্রণ: পুকুরে বেশি শেওলা হলে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। তাই শেওলা তুলে ফেলতে হয় বা কপার সালফেট পানিতে গুলিয়ে ছিটিয়ে দিলে শেওলা দমন হয়।

মাছ আহরণ: এ মাছ ৪-৫ মাসের মধ্যে বাজারজাত করার উপযোগী হয়। তবে সব মাছ ধরার জন্য উচিত না হলেও পুকুর শুকিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এক চাষে বিঘা প্রতি ২৫০-৩০০ কেজি বা বেশি মাছ হতে পারে। মাছ বাছাই করলে বেশি ফলন হয়।

রোগ ব্যবস্থাপনা: জীবমাত্রই রোগ-ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। পুকুরে মাছ সাধারণত পরজীবী জীবাণু দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়। এছাড়া খাদ্যাভাব, অনুপোযোগী খাদ্য, অক্সিজেনের অভাব, অতিরিক্ত তাপ বা ঠান্ডা, বিরূপ পরিবেশ ইত্যাদি দ্বারাও মাছ রোগাক্রান্ত হতে পারে। অন্য জীবের ন্যায় মাছেরও চিকিৎসা নয়, রোগ প্রতিরোধই উত্তম পন্থা।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যবেক্ষণ এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url