রাজপুটি মাছের চাষ পদ্ধতি

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে রাজপুটি মাছের চাষ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।

রাজপুটি মাছের চাষ পদ্ধতি

রাজপুটি মাছের চাষ পদ্ধতি (Methods of Raj punti culture) দেশে জনসংখ্যা যে হারে বেড়েছে নানা কারণে মাছের উৎপাদন সে হারে বাড়েনি। ফলে মাথাপিছু মাছের প্রাপ্যতা দিন দিন হ্রাস পেয়েছে। অথচ সারা দেশে ছড়িয়ে আছে মাছ চাষ উপযোগী অসংখ্য পুকুর, ডোবা, জলাশয়। বছরের অধিকাংশ সময় এগুলো পতিত থাকে।

একটু চেষ্টা করলেই এসব জলাশয়ে সহজেই স্বল্প সময়ে, অল্পশ্রমে এবং কম খরচে মাছ চাষ, করা সম্ভব। এমনই একটি সম্ভাবনাময় মাছ হচ্ছে রাজপুটি। রাজপুটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল সুস্বাদু মাছ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর চাষ হয়। এ মাছটি দেখতে অনেকটা দেশি সরপুঁটির মতো। মাছটি থাইল্যান্ড থেকে ১৯৭৭ সালে এদেশে আমদানি করা হয়েছে।

রাজপুটি মাছের বৈশিষ্ট্য:
  1. এটি বেশ শক্ত গড়নের অধিক ফলনশীল এবং সুস্বাদু।
  2. তুলনামূলক কম অক্সিজেন ও বেশি তাপমাত্রাযুক্ত পানিতে এটি টিকে থাকতে পারে।
  3. প্রায় সব ধরনের প্রাকৃতিক খাদ্যই এরা গ্রহণ করে। তবে X ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ এদের প্রিয় খাদ্য।
  4. ছোট বড় সব রকমের ডোবা, পুকুর, দীঘি ও পরিত্যক্ত জলাশয়ে এমনকি ধান ক্ষেতেও চাষ করা যায়।
  5. ঘোলা পানিতেও চাষ করা যায়। এদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ রাজপুটির জন্য খুবই উপযোগী।
  6. তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ে স্বল্প ব্যয়ে সহজেই চাষ করা সম্ভব।
  7. কুইজাতীয় মাছের সাথে মিশ্র চাষ পদ্ধতিতেও চাষ করা যায়।
  8. দেশি সরপুঁটির তুলনায় ৪০-৫০% বেশি বাড়ে।

নিচে রাজপুটি মাছের একক চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

পুকুর তৈরি: পুকুরের আয়তন ২৫ শতাংশের কম এবং ১ একরের বেশি না হলে ভালো হয়। তবে বাৎসরিক ও মৌসুমি দু'ধরনের পুকুরেই ভালোভাবে চাষ করা যায়। পানির গভীরতা ১-১.৫ মিটার পর্যন্ত বেশি উপযোগী। পুকুর, ডোবা বা যেকোনো বন্ধ জলাশয়ের পাড় বর্ষার আগে মজবুত করে নিতে হবে। কেননা বন্যার বা বৃষ্টির পানি জলাশয়ে ঢুকতে পারলে সেদিক দিয়ে এ মাছ দ্রুতই বেরিয়ে যেতে পারে।

জলাশয় প্রস্তুতি। শোনা যাষ ছাড়ার আগে কচুরিপানা, টোপাপানা, শেওলা দেখা দিলে তা ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। পুকুরে যাতে রাক্ষুসে মাছ না থাকে সে জন্য জাল টেনে, শুকিয়ে বা গুকানো সম্ভব না হলে রোটেনন (০.৫-১ মিটার গরীর পানির জন্য ২০-৩০ গ্রাম/শতাংশ) ব্যবহার করে জলাশয় রাক্ষুসে মাহযুক্ত করে নিতে হয়।

তবে আগাছা ও রাক্ষুদে মাছ অপসারণের পর স্বাভাবিক নিয়মে প্রতি শতাংশে ১০১.৫ কেজি কলিচুন পানিতে গুলিয়ে সমস্ত জলাশয়ে (মাছ চাষের স্থানে) ছিটিয়ে নিতে হবে। পুরুষের তলা শুকানো সম্ভব হলে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে বা লাঙল দিয়ে চাষ করে দিতে হবে।

চুন প্রয়োগের ৭ দিন পর জৈব সার (গোবর) প্রতি শতাংশে ৪০৬ কেজি বা ৩-৪ কেজি মুরগির নিষ্ঠা ছিটিয়ে দিতে হবে। সার প্রয়োগের ৪-৫ দিন পর পানির রং হালকা সবুজাভ হবে, এ পরিবেশে রাজপুটি রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে শুকানো পুকুরে সার দেওয়ার পরই পানি দিতে হয়।

পুকুরের আগাছা, রাক্ষুসে ও বাজে মাছ অপসারণের ৩-৪ দিন পর চুন প্রয়োগ করতে হয়। চুন প্রয়োগের ফলে (১) পানির ঘোলাত্ব দূরীভূত হয়, (২) সারের কার্যকারিতা বাড়ে, (৩) মাটি ও পানির পিএইচ মাছ চাষের উপযোগী হয়, (৪) পরজীবী ও রোগজীবাণু ধ্বংস হয়, (৫) পুকুরের তলদেশের জৈব পদার্থ পচনের হার বাড়িয়ে পুষ্টি উপাদানের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়।

পুকুরে চুন প্রয়োগ মাত্রা ও পদ্ধতি। পুকুরে সাধারণত পোড়া চুন (পাদুরে চুন হিসেবে পরিচিত) প্রয়োগ করা হয়। বিভিন্ন ধরনের মাটিতে চুনের মাত্রা কমবেশি হয়ে থাকে। যেমন-

পুকুরে চুন প্রয়োগ মাত্রা ও পদ্ধতি

পুকুরের পানিতে মাছ থাকা অবস্থায় প্রয়োজনীয় চুনের ২/৩ ভাগ করে কমপক্ষে ১২ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে একদিনে ১-২ কেজি/শতাংশ একবারে না দিয়ে ২-৩ দিন পর পর প্রয়োগ করতে হয়। পুকুরের তলদেশ ও পাড় চাষ/কোপানো হলে প্রয়োজনীয় মাত্রার চুন পুকুরের পাড়সহ ছিটিয়ে দিতে হয়।

চুন পানির কার্বন ডাইঅক্সাইডের সাথে মিশে ক্যালসিয়াম বাই কার্বনেট তৈরি করে। যা কার্বন ডাইঅক্সাইডের উৎস হিসেবে কাজ করে। উদ্ভিদ সূর্য কিরণের উপস্থিতিতে কার্বন ডাইঅক্সাইডকে (কার্বন) কাজে লাগিয়ে খাদ্য তৈরি করে ও অক্সিজেন মুক্ত করে, যা মাছ তথা পুঁটি মাছের জন্য অতীব প্রয়োজন।

চুন প্রয়োগে সতর্কতা। (১) চুন কোনোভাবেই প্লাস্টিকের পাত্রে গুলানো উচিত নয়। (২) চুন-গুলানো ও ছিটানোর সময় নাক-মুখ গামছা/মাক্স দিয়ে ঢেকে নিতে হবে। (৩) পাত্রে পানি ঢেলে নিয়ে তারপর চুন দেওয়া উচিত। (৪) বাতাসের প্রতিকূলে না গিয়ে বাতাসের অনুকূলে চুন ছিটাতে হবে। (৫) চোখে চুন লাগলে দ্রুত পরিষ্কার পানি দিয়ে বার বার ধুয়ে ফেলতে হবে।

পুকুরের মাটি ও পরিবেশ

১. মাটির পিএইচ ৬.০-৮.০ এর মধ্যে হওয়া দরকার। জলাশয়ের তলায় নরম ও কালো কাদা অথবা পলিমাটি থাকলে পুকুরে উৎপাদন ভালো হবে। জলাশয়ের তলার মাটিতে সামান্য ফসফেট, নাইট্রোজেন ও কার্বন থাকা ভালো। তবে পটাশ প্রয়োজনমতো থাকলে জলজ উদ্ভিদের বৃদ্ধি ভালো হয়।

২. পানিতে Mud Particle বেশি ভাসতে থাকলে সূর্য কিরণ বাধাপ্রাপ্ত হবে এবং Photosynthesis কম হবে, ফলে পানিতে খাবারের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। পানি আলোড়িত করলে অক্সিজেন যোগ হবে।

৩. রাজপুটি পানির অক্সিজেনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু জিওল, কই, চিতল, ফলি অতিরিক্ত শ্বসন অঙ্গ দ্বারা বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে বাঁচতে পারে। পানিতে অক্সিজেন দু'ভাবে দ্রবীভূত হয়। যথা-

ক. পানির উপরিভাগে বায়ুমণ্ডল থেকে পানিতে অক্সিজেন দ্রবীভূত হওয়ার মাধ্যমে।
খ. জলাশয়ে জলজ উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া খারা।

তবে দ্বিতীয় পদ্ধতিতে পানিতে বেশি অক্সিজেন গ্যাস দ্রবীভূত হয়। যেমন। ৬৫ ৮০% অক্সিজেন প্রবীভূত হয়া সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে এবং ২০-৪২% হয় প্রবাহিত বাতাসের মাধ্যমে।

১. পুকুরে মাছের খাবারের ঘাটতি দেখা দিলে প্রতি শতাংশে ১৫০-২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০-৭৫ গ্রাম টিএসপি, ২০- ২৫ গ্রাম এমওপি সার গুলিয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে।

২. পুকুরে বড় আগাছা থাকলে তা পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। পোনা মজুদ। সার প্রয়োগের ৭ দিনের মধ্যে পানির রং সবুজ বা হালকা বাদামি রং ধারণ করবে। এ অবস্থায় শতাংশ প্রতি ৫-৭ সে.মি. আকারের ৭০-৮০টি পোনা মজুদ করা যায়। অর্থাৎ একরে ৭০০০ - ৮০০০টি পোনা।

আহরণ: ভালোভাবে চাষ করলে ছয় মাসে মাছের ওজন ১৫০ ১৭০ গ্রাম হয়ে থাকে, ফলে প্রতি বিঘা থেকে ২২৫ হতে ২৫০ কেজি মাছ পাওয়া সম্ভব। পোনা ছাড়ার ৫ থেকে ৬ মাস পরে এ মাছ বাজারজাত করা যায়। অর্থাৎ একই পুকুরে বছরে দু'বার ফলন পাওয়া সম্ভব। পুকুর থেকে খুব সকালে মাছ আহরণ করা হলে বাজারজাত করা সহজ হয়। তবে আধা নিবিড় পদ্ধতিতে ৫-৬ মাসে প্রতি শতাংশে ১০ ১২ কেজি মাছ উৎপাদন হতে পারে।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা: মাসে অন্তত ২ বার জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হয়। শীতকালে লেজ ও পাখনা পচা, গায়ে লাল লাল দাগ, আঁইশ খসা ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই শীত শুরুর আগেই শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করা যেতে পারে।

রাজপুটি মাছ চাষের প্রযুক্তি বাস্তবায়ন পঞ্জিকা:

রাজপুঁটি মাছ চাষের প্রযুক্তি বাস্তবায়ন পঞ্জিকা

একক চাষে সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ ও সার প্রয়োগ: পুকুরে পোনা ছাড়ার পরের দিন থেকে প্রতিদিন সকালে ও বিকালে সম্পূরক খাদ্য দিতে হয় (ছক)। তবে তা হতে হবে মাছের দেহের ওজনের শতকরা ৫-৮% হারে চাউলের কুঁড়া (৮০%) ও সরিষার খৈল (২০%) এর মিশ্রণ।

পোনা মাছের ওজন বৃদ্ধির সাথে সাথে খাবারের পরিমাণও বাড়াতে হয়। সেজন্য প্রতি মাসে একবার জাল টেনে মাছের নমুনায়ন করে মোট ওজন নির্ধারণ করে নিতে হয়। জলাশয়ে সরবরাহকৃত খাবারের অর্ধেক শুকনো হিসেবে ছিটিয়ে এবং অর্ধেক পানিতে ভিজিয়ে বল বানিয়ে দেওয়া ভালো।

রাজপুটির জন্য এ খাবার ছাড়াও ক্ষুদিপানা, নরম ঘাস, শেওলা ইত্যাদি দেওয়া যেতে পারে। পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য (ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুপ্ল্যাঙ্কটন) তৈরির জন্য ১৫ দিন পর পর শতাংশ প্রতি ৫-৬ কেজি গোবর প্রয়োগ করতে হবে। পানির রং সবুজ থাকা অবস্থায় সার ব্যবহার করা উচিত নয়।

রাজপুটি মাছের অর্থনৈতিক গুরুত্ব:

জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ, পতিত জলাশয় ব্যবহারসহ গবেষণা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে রাজপুটি মাছের গুরুত্ব অপরিসীম। কম গভীরতায় অল্প দিনে এবং অল্প খরচে সহজেই এ মাছ চাষ করা যায়।

কার্প জাতীয় মাছের সাথে মিশ্রভাবে চাষ করা যায়। যেকোনো ধরনের স্বল্প ব্যয়ের খাবার দিয়ে প্রতিপালন করা যায়। কম অক্সিজেন, বেশি তাপমাত্রা এবং ঘোলা পানিতে অন্য মাছ যেখানে চাষ করা কষ্টসাধ্য সেখানে রাজপুটি অনায়াসে চাষ করা যায়।

এ মাছের রোগবালাই অন্যান্য মাছ অপেক্ষা কম হয়। একই জলাশয়ে বছরে দু'বার চাষ করা যায়। কেননা ৬ মাসে একটি রাজপুটি ১৫০-১৭০ গ্রাম ওজনের হয় এবং এ সময় বাজারজাত করার উপযোগী হয়। ছোট ছোট জলাশয়ে চাষ করা সহজসাধ্য ও লাভজনক।

৩৩ শতক জলাশয়ে একবারে ৩০০ কেজি পর্যন্ত অর্থাৎ বছরে দু'বারে প্রায় ৬০০ কেজি মাছ পাওয়া সম্ভব। রাজপুটি মাছের পাকস্থলী না থাকায় আহারযোগ্য অংশ অনেক মাছ অপেক্ষা বেশি। এরা অন্ননালীর মাধ্যমেই খাদ্য পরিপাক ক্রিয়া সম্পন্ন করে।

এরা স্রোতযুক্ত পানিতেও প্রজনন করে বলে নদী-নালায় বংশবিস্তার করতে পারে। তবে বিশেষত্ব হলো যে সিলভার কার্প, মিরর কার্প, মনোসেক্স তেলাপিয়ার সাথে মিশ্রভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক (৫০- ৬০% সংখ্যায়) পোনা ছাড়া যায়। তবে বড় পুকুরে মিশ্রচাষ করা বেশি লাভজনক।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। রাজপুটি মাছের চাষ পদ্ধতি এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url