বাংলাদেশের মৃত্তিকার বর্ণনা দাও | মৃত্তিকা কী? বাংলাদেশের মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগ বর্ণনা কর

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে বাংলাদেশের মৃত্তিকার বর্ণনা দাও | মৃত্তিকা কী? বাংলাদেশের মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগ বর্ণনা কর নিয়ে আলোচনা করব।

বাংলাদেশের মৃত্তিকার বর্ণনা দাও। অথবা, বাংলাদেশের মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগপূর্বক বর্ণনা দাও। অথবা, মৃত্তিকা কী? বাংলাদেশের মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগ বর্ণনা কর।

বাংলাদেশের মৃত্তিকার বর্ণনা

ভূমিকা

ভূ-ত্বকের বহিরাবরণের সূক্ষ্ম পদার্থের শিথিল কোমল স্তরকে শিলা বলে। এ মৃত্তিকা খনিজ ও জৈব পদার্থ, পানি, বায়ু ইত্যাদি মিশ্রণে গঠিত হয়। মৃত্তিকা শিলা হতে উৎপত্তি হয়। বাংলাদেশের সর্বত্র একই ধরনের মৃত্তিকা পরিলক্ষিত হয় না। বিভিন্ন অঞ্চলের মৃত্তিকার গঠনপ্রণালি, পানি ধারণ ক্ষমতা ও বর্ণ ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই বিভিন্ন ভূগোলবিজ্ঞানী ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাজন করেছেন।

যেমন- এইচ ব্রামার ১৯৬৯ সালে মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ এবং আদি শিলার উপর ভিত্তি করে, অধ্যাপক বি. করিম ও জনাব হোসেন ১৯৫৭ সালে জলবায়ু ও মৃত্তিকা গঠনের নিয়ামকের উপর ভিত্তি করে এবং প্রখ্যাত ভূগোলবিদ ড. এস. ইসলাম ভূ-তাত্ত্বিক উৎপত্তি এবং প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক গঠনের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের মুক্তিকার শ্রেণিবিভাজন করেন।

বাংলাদেশের মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগ

বর্তমানে শিক্ষামূলক কাজে নিচের শ্রেণিবিন্যাসটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের মৃত্তিকাকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথাঃ

১। পাহাড়ি মৃত্তিকা। ২। লোহিত বা সোপান সমভূমির মৃত্তিকা। ৩। পাললিক বা প্লাবন সমভূমির মৃত্তিকা। আবার, প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক গঠনের উপর ভিত্তি করে এদেশের মৃত্তিকাকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ

১। পাহাড়ি মৃত্তিকা:

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সর্বমোট প্রায় ১৮,৫৯০ বর্গকিলোমিটার ব্যাপী পাহাড়িয়া মৃত্তিকার অবস্থান। টারশিয়ারি যুগের বেলেপাথর ও কর্দম শিলা হতে এ জাতীয় মৃত্তিকা গঠিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়িয়া অঞ্চল, সিলেট জেলার উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল এবং ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চলে পাহাড়িয়া মৃত্তিকা দেখা যায়।

২। লোহিত মৃত্তিকা:

বাংলাদেশের অপেক্ষাকৃত উঁচু প্লাইস্টোসিন চত্বরগুলোতে এ ধরনের মাটি দেখতে পাওয়া যায়। এর আয়তন প্রায় ১১,০৯৫ কাঁকিলোমিটার। প্লাইস্টোসিন যুগের এ চত্বরগুলো ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর গড়, গাজীপুর জেলার ভাওয়ালের গড়, উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র ভূমি এবং কুমিল্লা জেলার লালমাই পাহাড় নামে পরিচিত। এসব অঞ্চলের মৃত্তিকায় চুনের পরিমাণ বেশি। রাসায়নিক দিক হতে এসব মৃত্তিকাকে ল্যাটেরাইট শ্রেণির মৃত্তিকা বলা যায়। লাল কাঁকরযুক্ত হওয়ায় এ মৃত্তিকার বর্ণ লাল। তাই একে লোহিত মৃত্তিকা বলে।

৩। লবণাক্ত মৃত্তিকা:

বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকাসহ উপকূলবর্তী অঞ্চলে লবণাক্ত মাটি দেখা যায়। লবণাক্ত মাটির মোট আয়তন প্রায় ৭,৫৫৭ বর্গকিলোমিটার। জোয়ারের সময় উপকূলবর্তী অঞ্চলের সমুদ্রের পানি প্রবেশ করায় মৃত্তিকা লবণাক্ত হয়ে পড়ে। তাই এ অঞ্চলের মৃত্তিকাকে লবণাক্ত মৃত্তিকা বলে। সুন্দরবনের দক্ষিণাঞ্চলের, পটুয়াখালী এবং বরিশাল জেলায় এ মৃত্তিকা 'মহিনা' নামে পরিচিত।

৪। পাললিক মৃত্তিকা:

সুন্দরবন ও উপকূলবর্তী লবণাক্ত মৃত্তিকা ব্যতীত বাংলাদেশের সব প্লাবন সমভূমিগুলো আধুনিক যুগের পাললিক মৃত্তিকা দ্বারা গঠিত। এর আয়তন প্রায় ১,০৬,৮৩৮ বর্গকিলোমিটার। এদের মধ্যে দোআঁশ, বেলে ও কাদা- এ তিন ধরনের মাটি দৃষ্ট হয়। মাটির বর্ণ, কণার আকার এবং রাসায়নিক উপকরণের বৈষম্য অনুযায়ী এ মৃত্তিকার উর্বরতা বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়।

এ কারণে পদ্মা নদীর পলি সঞ্চিত অঞ্চলের মৃত্তিকায় অধিক ফসল উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশের পাললিক মৃত্তিকা অঞ্চলকে পুনরায় তিনটি মৃত্তিকা অঞ্চলে ভাগ করা হয়; যথা: (ক) ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটি অঞ্চল: টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা ও চট্টগ্রামের অংশবিশেষ এবং কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলার প্রায় সমগ্র অংশই এ অঞ্চলের অন্ত র্গত। এ অঞ্চলের মাটি খুবই উর্বর। এ মাটি এঁটেল ও বেলে-দোআঁশ। প্রায় ৪,০৯৬ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে এ মৃত্তিকা অঞ্চল বিস্তৃত।


(খ) গঙ্গার পলিমাটি অঞ্চল: পাবনা, 'রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, ঢাকা জেলার গঙ্গা নদীবিধৌত ভূমি নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এ অঞ্চলের মাটি উর্বর এবং চুনসমৃদ্ধ। ব্রহ্মপুত্রের পলল অপেক্ষা গঙ্গার তলানিতে চুনের পরিমাণ বেশি। ২৭,৪৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ মৃত্তিকা অঞ্চল বিস্তৃত।

(গ) তিস্তার পলিমাটি অঞ্চল: রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও পাবনার অংশবিশেষ নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এর আয়তন ১৬,৬৪০ বর্গকিলোমিটার। এ অঞ্চলের মাটি মোটামুটিভাবে উর্বর, তবে চুনের পরিমাণ খুবই কম। এ মাটিতে বেলে, দোআঁশ ও পলি দোআঁশ দৃষ্টিগোচর হয়। এ অঞ্চলের মাটিতে ধান, তামাক ও আখ ভালো হয়।


৫। কোষ মৃত্তিকা:

চট্টগ্রামের উপকূলে পুনরুদ্ধারকৃত কিছু বিলা জমি ৫ থেকে ৬ বছর পর পর সম্পূর্ণরূপে কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়। স্থানীয় ভাষায় এ জাতীয় মৃত্তিকাকে কোষ মৃত্তিকা বলে। এ জাতীয় মৃত্তিকায় অম্লের পরিমাণ বেশি এবং এর উপরাংশের বর্ণ বাদামি বা হলদে। চুন বা ফসফেট জাতীয় সার প্রয়োগ করে এ মৃত্তিকায় কৃষিকাজ করা যায়। স্বাভাবিকভাবে এ শ্রেণির মৃত্তিকা ৫০ থেকে ৬০ বছর পর চাষের উপযোগী হয়।

উপসংহার

পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এবং এদের উপনদী ও শাখা নদী দ্বারা বাহিত পলি দ্বারা নদীমাতৃক বাংলাদেশের মৃত্তিকা গঠিত, যার ফলে বাংলাদেশ উর্বর মৃত্তিকার দেশ। তা সত্ত্বেও এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকমের মৃত্তিকার বুনট ও গঠনগত তথা গুণগত পার্থক্য আছে বিধায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে প্রসিদ্ধ।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। বাংলাদেশের মৃত্তিকার বর্ণনা দাও | মৃত্তিকা কী? বাংলাদেশের মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগ বর্ণনা কর এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url