বাংলাদেশের অর্থকরী ফসলসমূহের বিবরণ দাও

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে বাংলাদেশের অর্থকরী ফসলসমূহের বিবরণ দাও নিয়ে আলোচনা করব।

বাংলাদেশের অর্থকরী ফসলসমূহের বিবরণ দাও

ভূমিকা

যেসব ফসল সরাসরি বাণিজ্যিক বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে উৎপাদন করা হয় সেসব ফসলকে অর্থকরী ফসল বলে। বাংলাদেশের অর্থকরী ফসলসমূহের মধ্যে পাট, চা, ইক্ষু, তামাক, তুলা, রাবার প্রভৃতি প্রধান। এগুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চাষ করা হয়।

নিম্নে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান অর্থকরী ফসলসমূহের বিবরণ দেয়া হলোঃ

১। পাট:

পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই পাটকে বাংলাদেশের সোনালি আঁশ বলা হয়। পরিমাণ ও গুণগত দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী পাট উৎপাদনকারী দেশ।

বাংলাদেশে পাট চাষের উপযোগী অবস্থাঃ বাংলাদেশে পাট চাষের উপযোগী অবস্থাসমূহ নিম্নরূপঃ

(অ) প্রাকৃতিক উপাদান: প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ হলোঃ (আ) অর্থনৈতিক উপাদানঃ অর্থনৈতিক উপাদানসমূহ হলো: (i) মূলধন ও (ii) শ্রমিক। (i) ভূপ্রকৃতি, (ii) মৃত্তিকা, (iii) জলবায়ু ও (iv) পর্যাপ্ত পানি।

উৎপাদনকারী অঞ্চল: বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই কম-বেশি পাট চাষ করা হয়। তবে ময়মনসিংহ, ঢাকা, কুমিল্লা অঞ্চলে সর্বাধিক পাট উৎপন্ন হয়। দেশের উৎপাদিত পাটের প্রায় ৪৫ শতাংশই এ সকল অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীতেও অধিক পরিমাণে পাট চাষ হয়।


উৎপাদন

২০২১-২২ অর্থবছরে ৭.৪৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করে ৮২.৭৭ লক্ষ বেল পাট উৎপাদিত হয়েছে।পার্টের বাণিজ্য: বাংলাদেশ প্রতি বছর পাট ও পাটজাত দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, কোরিয়া, জাপান, কানাডা বাংলাদেশের পাটের প্রধান ক্রেতা।

২। চাঃ

চা বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান অর্থকরী ফসল। এদেশের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চায়ের চাষ করা হয়। তাই উৎপাদিত চায়ের ৭৫ শতাংশই বিদেশে রপ্তানি করা হয়।

চা চাষের উপযোগী উপাদানসমূহ

(অ) প্রাকৃতিক উপাদানঃ প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ হলো (i) ভূপ্রকৃতি, (ii) মৃত্তিকা ও (iii) জলবায়ু। (আ) অর্থনৈতিক উপাদানঃ অর্থনৈতিক উপাদানসমূহ হলো ৪ (i) মূলধন, (ii) শ্রমিক, (iii) বাজার, (iv) উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ও (v) ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষ।

উৎপাদনকারী অঞ্চলঃ বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলায় চায়ের চাষ করা হয়। বাংলাদেশে মোট ১৫৮টি চা বাগান আছে। তন্মধ্যে ২০টি সিলেটে, ৯১টি মৌলভীবাজারে, ২৩টি হবিগঞ্জে, ২২টি চট্টগ্রামে ও ১টি রাঙামাটি ও ১টি ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আছে।

(ঙ) চায়ের বাণিজ্য: বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম চা রপ্তানিকারক দেশ। প্রতি বছর চা রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।

৩। ইক্ষু:

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইক্ষু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কারণ ইক্ষু চিনি উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। বাংলাদেশে প্রায় ৪.৩৪ লক্ষ একর জমিতে ইক্ষুর চাষ করা হয়। বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গ ইক্ষু চাষের আদি ভূমি বলে মনে করা হচ্ছে। ইক্ষু চাষের অনুকূল অবস্থাঃ ইক্ষু চাষের অনুকূল অবস্থানসমূহের মধ্যে রয়েছে- (1) ভূপ্রকৃতি, (ii) মৃত্তিকা, (iii) জলবায়ু, (iv) সার, (i) বীজ, (vi) কীটনাশক, (vii) মূলধন, (viii) শ্রমিক ও (ix) পরিবহন ব্যবস্থা। ইক্ষু উৎপাদনকারী অঞ্চল: বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতে কম-বেশি ইক্ষু উৎপাদিত হয়। তবে প্রধান প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো হলো- রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, বগুড়া, ঢাকা, ময়মনসিংহ, হরিপুর, ফরিদপুর প্রভৃতি।

বাণিজ্য: বাংলাদেশ এখনও ইক্ষু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাই বাংলাদেশকে প্রতি বছর বিদেশ হতে চিনি আমদানি করতে হয়।

৪। তামাক:

এটি বাংলাদেশের রবিশস্য। দেশের অনুকূল জলবায়ু ও উর্বর মৃত্তিকা তামাক চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী বলে এদেশে তামাক চাষ করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের উৎপাদিত তামাক নিকৃষ্টমানের। সামান্য পরিমাণ উৎকৃষ্টমানের ভার্জিনিয়া তামাক চাষ করা হয়। অনুকূল অবস্থা : তামাক উৎপাদনে অনুকূল উপাদানসমূহ হলোঃ

(i) উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু, (ii) হালকা দোআঁশ মৃত্তিকা, (iii) সমভূমি, (iv) মূলধন, (v) শ্রমিক ও (vi) ব্যাপক বাজার প্রভৃতি। উৎপাদনকারী অঞ্চল: রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, পাবনা তামাক চাষের জন্য প্রসিদ্ধ।

তামাকের বাণিজ্য: বাংলাদেশ তামাক উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাই ব্যাপক অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটানোর জন্য প্রতি বছর বিদেশ থেকে তামাক আমদানি করতে হয়।

৫। তুলা:

বাংলাদেশ তুলা চাষে তেমন উন্নতি লাভ করতে পারে নি। সম্প্রতি বাংলাদেশে তুলা চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদেশের মৃত্তিকা ও জলবায়ু তুলা চাষের উপযোগী। বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহে তুলার চাষ করা হয়। বাংলাদেশ তুলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ব্যাপক অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটানোর জন্য বাংলাদেশ বিদেশ হতে তুলা আমদানি করে থাকে।

৬। রাবার:

বাংলাদেশ রাবার উৎপাদনে তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামে, বান্দরবান ও সিলেট এলাকায় রাবার চাষ শুরু হয়। রাবার চাষের জন্য ২২° সে. হতে ২৭° সে. উত্তাপ এবং বার্ষিক ২৫০ সেমি এর অধিক বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন সংস্থার অধীনে ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষে ৮ হাজার ৮ শত একর এলাকাসহ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলে সাড়ে ৯০ হাজার একর জমিতে রাবার চাষ করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২ লক্ষ পাউন্ড কাঁচা রাবার উৎপাদিত হয়।

৭। রেশম:

রেশম বাংলাদেশের আর একটি অন্যতম অর্থকরী ফসল। এদেশের প্রধান রেশম উৎপাদন কেন্দ্র রাজশাহীতে অবস্থিত। রাজশাহীতে প্রায় ২০ হাজার একর জমিতে তুঁত গাছের চাষ করা হয়েছে। অন্যান্য রেশম উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো হলো কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বগুড়া। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় বার্ষিক ৪ হাজার টন রেশম উৎপন্ন হয়।

উপসংহার

উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, এদেশে অর্থনৈতিক ফসল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অধিক পরিমাণ অর্থকরী ফসল উৎপাদন সম্ভব। এতে একদিকে যেমন কৃষির উপর নির্ভরশীল শিল্পসমূহকে রক্ষা করা যাবে অন্যদিকে, প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ হবে।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। বাংলাদেশের অর্থকরী ফসলসমূহের বিবরণ দাও এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url