তুলা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থা, উৎপাদন ও বণ্টন আলোচনা কর

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে তুলা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থা, উৎপাদন ও বণ্টন আলোচনা কর নিয়ে আলোচনা করব।

তুলা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থা, উৎপাদন ও বণ্টন আলোচনা কর

ভূমিকাঃ

তুলা এক প্রকার তন্ত্র বা আঁশবিশেষ। খাদ্য ও পানীয়ের পর মানুষের দ্বিতীয় মৌলিক চাহিদা হলো বস্ত্র। যে সকল উপাদান হতে বস্ত্র তৈরি হয় তুলা সেগুলোর মধ্যে সর্বপ্রধান। পৃথিবীর মোট বস্ত্র উৎপাদনের ৭০% ভাগ তুলা হতে প্রস্তুত হয়। কার্পাস গাছের ফল থেকে যে আঁশ বের হয়, তাকে তুলা বলে। তুলা হতে সুতা প্রস্তুত করে তা দিয়ে কাপড় বোনা হয়। তুলা হতে লেপ, তোষক, বালিশ, শতরাঞ্জি প্রভৃতি তৈরি করা হয়। তুলা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থাঃ

(ক) প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ:

১। জলবায়ুঃ তুলা ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলের ফসল। এছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু তুলা চাষের বিশেষ উপযোগী।

  • উত্তাপ: তুলা উৎপাদনে বিভিন্ন সময়ে ২১০-২৮০ সে. তাপমাত্রা দরকার।
  • বৃষ্টিপাত : সাধারণত ৫০-১০০ সেমি বৃষ্টিপাত অঞ্চলে তুলা ভালো জন্মে।
  • আবহাওয়া: তুলা বীজ বপন থেকে আরম্ভ করে ফল পাকা পর্যন্ত মাঝে মাঝে বৃষ্টিপাতযুক্ত রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া তুলা চাষের উপযোগী।

২। মৃত্তিকাঃ চুনাময় দোঁআশ মৃত্তিকা তুলা চাষের জন্য আদর্শ। অগ্ন্যুৎপাত থেকে সৃষ্ট কৃষ্ণ মৃত্তিকা ও চারনোজেম মৃত্তিকাযুক্ত জমি তুলা উৎপাদনে বিশেষ সহায়ক।

৩। ভূপ্রকৃতিঃ পানি জমে থাকে না এরূপ জমি তুলা চাষের উপযোগী। সমভূমি বা সামান্য উঁচু ভূমিতে পানি সেচ ও পনি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা সুবিধাজনক বলে এরূপ এলাকায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে তুলা চাষ উন্নতি লাভ করেছে।

(খ) অর্থনৈতিক উপাদানসমূহ:

১। শ্রমিক: তুলা চাষ, তত্ত্বাবধান, সংগ্রহ, সার, বীজ, সেচ, বপন ইত্যাদি কাজের জন্য প্রচুর দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন। তাই সুলভে প্রচুর শ্রমিক প্রাপ্তি তুলা চাষের জন্য সহায়ক।

২। মূলধন: তুলা চাষের জন্য প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন। বীজ, সংগ্রহ, সার ক্রয়, আধুনিক যন্ত্রপাতি, বাজারজাতকরণ, শ্রমিকের পারিশ্রমিক প্রদানের জন্য অর্থসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

৩। উন্নত বীজ: উন্নতমানের তুলা উৎপাদনের জন্য অবশ্যই উন্নতমানের বীজ ব্যবহার করতে হবে। উন্নত বীজ তুলা উৎপাদনের পরিমাণ ও মানবৃদ্ধির সহায়ক।

৪। সার প্রয়োগ: জৈবিক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজন।

৫। পানি সেচ: বৃষ্টিপাত কম হলে কার্পাস ক্ষেতে পানি সেচের ব্যবস্থা করা দরকার হয়।

৬। কীটনাশক ওষুধ: পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে কার্পাস চারা রক্ষার জন্য ওষুধ স্প্রে করা প্রয়োজন।

৭। বাজার: তুলা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করা হয়। এজন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার উপর এর উন্নতি নির্ভরশীল।

৮। পরিবহন: উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা তুলা চাষের সহায়ক। বাজারজাতকরণ, গুদামজাতকরণের সুষ্ঠু যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক।

(গ) রাজনৈতিক উপাদানঃ

১। সরকারের নীতি: সরকারের সুষ্ঠু রাজনীতি তুলা উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

২। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের নীতির উপর তুলা উৎপাদন নির্ভরশীল। তাই অভ্যন্ত রীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার বিস্তৃতির জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগের প্রয়োজন।

তুলা চাষের অনুকূল উক্ত প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উপাদানগুলো পৃথিবীর যে সকল অঞ্চলে বিদ্যমান রয়েছে সে সকল অঞ্চলে অধিক তুলা উৎপাদিত হয়। বিশ্বব্যাপী তুলার উৎপাদন ও বণ্টনের বিবরণঃ নিম্নে তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর বর্ণনা দেয়া হলো:-

তুলা উৎপাদনে এশিয়া মহদেশ বিশ্বে প্রথম, উত্তর আমেরিকা দ্বিতীয়, আফ্রিকা তৃতীয়। পৃথিবীর প্রায় ৭৭টি দেশে অর্থকরী ফসল এবং ৬০টি দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস হিসেবে তুলার চাষ হয়।

তুলা উৎপাদনকারী অঞ্চলসমূহঃ

তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলো ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত। পৃথিবীর প্রধান তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন, আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস, সিরিয়া, মিশর, মালি প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নিম্নে প্রধান প্রধান দেশগুলোর তুলা উৎপাদন ও বণ্টন আলোচনা করা হলোঃ

১। চীন: বর্তমানে তুলা উৎপাদনে চীন বিশ্বে প্রথম। পূর্বে এর স্থান ছিল তৃতীয়। ২০২১-২২ সালে চীনে প্রায় ৫৮৭৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন তুলা উৎপাদন হয়। প্রধানত উত্তর ও মধ্য চীনে তুলার চাষ হয়। তন্মধ্যে ইয়াংসি নদীর নিম্ন উপত্যকা ও হোয়াংহো নদীর অববাহিকায় অবস্থিত অঞ্চলগুলোতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে তুলার চাষ করা হয়।

২। ভারত: তুলা উৎপাদনে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় এবং এশিয়ায় দ্বিতীয়। ২০২১-২২ সালে ভারতে ২৫৩৩৪ মিলিনয় মেট্রিক টন তুলা উৎপন্ন হয়। দাক্ষিণাত্যের মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশ তুলা চাষে প্রসিদ্ধ। এছাড়া উত্তর ভারতের উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও রাজস্থানের অংশবিশেষে এবং দক্ষিণ ভারতের তামিলনাডু, অন্ধ্র ও কর্নাটক অঞ্চলেও প্রচুর তুলার চাষ হয়ে থাকে।

৩। যুক্তরাষ্ট্র: বর্তমানে তুলা উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে দ্বিতীয়। ২০২১-২২ সালে এদেশ প্রায় ৩৮১৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন তুলা উৎপন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রে তুলা বলয়টি টেক্সাস, ক্যারোলিনা, মিসিসিপি, আরকানসাস, আলাবামা, জর্জিয়া, টেনিসি, মিসৌরি, কেন্টাকি প্রভৃতি রাজ্যের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত।

৪। ব্রাজিল: দক্ষিণ আমেরিকার প্রধান এবং বিশ্বের ৪র্থ তুলা উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিল। ২০২১-২২ সালে এদেশ ২৬৭৮ মিলিয়ন তুলা উৎপন্ন হয়। এদেশের অধিকাংশ তুলা উন্নতমানের। 

৫। পাকিস্তান: তুলা উৎপাদনে পাকিস্তান বিশ্বের ৫ম এবং এশিয়ার তৃতীয় প্রধান তুলা উৎপাদনকারী দেশ। ২০২১-২২ সালে এদেশে প্রায় ১৩০৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন তুলা উৎপন্ন হয়। পাকিস্তানে উৎপন্ন তুলার প্রায় ৯০% উন্নতমানের দীর্ঘ আঁশবিশিষ্ট এবং অবশিষ্ট ১০% মাঝারি ও ক্ষুদ্র আঁশযুক্ত। সিন্ধুনদের অববাহিকায় পানি সেচের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে তুলার চাষ হয়ে থাকে। এদেশ চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশে তুলা রপ্তানি করে।

৬। অস্ট্রেলিয়া: তুলা উৎপাদনে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বে অষ্টম এবং রপ্তানিতে তৃতীয়। এর কুইন্সল্যান্ডে ও দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় তুলার চাষ হয়। ২০২১-২২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় উৎপন্ন তুলার পরিমাণ ছিল মাত্র ১১৯৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এটি পৃথিবীর মোট উৎপন্ন তুলার প্রায় ২.৬৬%। ৭। তুরস্ক: তুলা উৎপাদনে এদেশ বিশ্বে ৭ম এবং এশিয়ায় পঞ্চম। ২০২১-২২ সালে এদেশে ৮২৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন তুলা উৎপন্ন হয়।

৮। উজবেকিস্তান: তুলা উৎপাদনে উজবেকিস্তান বিশ্বে ৮ম। ২০২১-২২ সালে এদেশে ৫৭৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন তুলা উৎপন্ন হয়। এদেশের লম্বা ও মধ্য আঁশযুক্ত তুলার উৎপাদনই বেশি। এর আরল সাগর ও আণু রিয়ার তীর এবং সমরখন্দ এলাকাতে সর্বাধিক তুলা জন্মে।

৯। আর্জেন্টিনা: ২০২১-২২ সালে আর্জেন্টিনায় ৩২৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন তুলা উৎপাদিত হয়।

১০। মালি: মালি আফ্রিকার অন্যতম প্রধান তুলা উৎপাদনকারী দেশ। ২০২১-২২ সালে এদেশে প্রায় ৩১১ মিলিয়ন মেট্রিক টন। তুলা উৎপন্ন হয়। মালির তুলাও দীর্ঘ আঁশযুক্ত। এ তুলার প্রায় সবই বিদেশে রপ্তানি হয়।

তুলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তুলা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ তুলা উৎপাদনকারী দেশের সংখ্যা খুবই কম এবং তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অধিক। আবার শিল্পোন্নত দেশগুলোতে তুলার উৎপাদন বেশ কম অথবা মোটেই উৎপাদিত হয় না। ফলে জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম ও কানাডার মতো শিল্পোন্নত দেশগুলোকে বিদেশ হতে তুলা আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজারে বার্ষিক রপ্তানিকৃত তুলার পরিমাণ প্রায় ৬৭ লক্ষ ১৪ হাজার মেট্রিক টন।

রপ্তানিকারক দেশসমূহ: তুলা রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে প্রথম, ভারত দ্বিতীয়, ব্রাজিল তৃতীয় এবং অস্ট্রেলিয়া চতুর্থ, গ্রিস পঞ্চম। অন্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে মালি, মিশর, বুকিনা, ফ্রান্স, জিম্বাবুয়ে, ক্যামেরুন, তাঞ্জানিয়া, পাকিস্তান ভারত, তাজিকিস্তান, বেনিন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

আমাদানিকারক দেশসমূহ: তুলা আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে চীন চতুর্থ। এছাড়া থাইল্যান্ড, ভারত, চীন, ব্রাজিল, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, পর্তুগাল, জার্মানি, ফ্রান্স, পাকিস্তান, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশও বিশ্ববাজার হতে প্রচুর তুলা আমদানি করে।

উপসংহার:

মানবসভ্যতার প্রধান উপকরণ হচ্ছে বস্ত্র। মোট ৭০% বস্ত্র তুলা হতে প্রস্তুত হয়। তুলা উৎপাদন কতিপয় দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ। তুলা থেকে বস্ত্র, কাপড়, লেপ ও নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত করা হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমণ্ডলে তুলার অবদান অনস্বীকার্য।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। তুলা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থা, উৎপাদন ও বণ্টন আলোচনা কর এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url