মুদ্রার মূল্যের সংজ্ঞা দাও | আধুনিক অর্থনীতিতে মুদ্রার গুরুত্ব আলোচনা কর

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে মুদ্রার মূল্যের সংজ্ঞা দাও | আধুনিক অর্থনীতিতে মুদ্রার গুরুত্ব আলোচনা কর নিয়ে আলোচনা করব।

মুদ্রার মূল্যের সংজ্ঞা দাও। আধুনিক অর্থনীতিতে মুদ্রার গুরুত্ব আলোচনা কর।

মুদ্রার মূল্যের সংজ্ঞা দাও। আধুনিক অর্থনীতিতে মুদ্রার গুরুত্ব আলোচনা কর। অথবা, অর্থের মূল্য কাকে বলে? আধুনিক অর্থনীতিতে অর্থের গুরুত্ব/ভূমিকা বর্ণনা কর।

মুদ্রা/অর্থের মূল্যঃ 'অর্থের মূল্য' বলতে অর্থের ক্রয়ক্ষমতাকে বুঝায়। অর্থের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই। অর্থ দ্বারা বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করা হয়। এজন্য অর্থের মূল্য দ্রব্যসামগ্রীর মাধ্যমে প্রদান করা হয়। কোনো নির্দিষ্টসংখ্যক অর্থ দ্বারা যে পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করা যায়, তাই হলো অর্থের মূল্য।

কটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দ্বারা যদি পূর্বাপেক্ষা অধিক দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করা যায় তাহলে বুঝতে হবে অর্থের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পক্ষান্তরে, যদি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দ্বারা সর্বাপেক্ষা কম দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করা যায় তাহলে বুঝতে হবে অর্থের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। সুতরাং অর্থের মূল্য বলতে তার ক্রয়ক্ষমতাকেই বুঝায়।

  • ডি. এইচ, রবার্টসন-এর মতে, এক একক অর্থের বিনিময়ে সাধারণভাবে যে পরিমাণ দ্রব্য ও সেবাকর্ম ক্রয় করা যায় তাকে। সেই অর্থের মূল্য বলা হয়।
  • অধ্যাপক হ্যানসেন-এর মতে, "অর্থ যা ক্রয় করে তাই অর্থের মূল্য।

আধুনিক অর্থনীতিতে অর্থের/মুদ্রার গুরুত্বঃ অর্থ আধুনিক অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উৎপাদন, বিনিময়, বণ্টন, ভোগ ইত্যাদি যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ প্রধান চালিকাশক্তি রূপে কাজ করে এবং গোটা অর্থনৈতিক সমাজকে কর্মক্ষম ও গতিশীল রাখে। এজন্যই আধুনিক অর্থনীতিকে 'মুদ্রা অর্থনীতি' বলা হয়। আধুনিক অর্থনীতিতে অর্থের গুরুত্ব নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ

  1. বিনিময় ব্যবস্থা সহজ ও সরলীকরণ: বিনিময়ের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে অর্থ বিনিময় ব্যবস্থাকে বাধাহীন ও কার্যকর করেছে। অর্থ যেহেতু বিনিময়ের সর্বজনগ্রাহ্য মাধ্যম তাই ব্যবসায়িক লেনদেনে দ্রব্যের বদলে দ্রব্যের বিনিময়ের আর প্রয়োজন পড়ে না এবং লেনদেনও আটকে থাকে না। অর্থের সাহায্যে কোনো বাধা ছাড়াই দূরে ও কাছে দ্রব্য ও সেবার লেনদেন সম্পন্ন করা যায়। এর ফলে ব্যক্তিগত, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দ্রব্য ও সেবার লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ ও ব্যাপকতর হয়েছে। সাথে সাথে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা ও পরিধি বেড়েছে।
  2. মূল্যের পরিমাপক: হিসাবের একক ও মূল্যের পরিমাপক হিসেবে অর্থের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিনিময় প্রথায় একটি দ্রব্যের বদলে অন্য একটি দ্রব্য কতটা বা কী পরিমাণ বিনিময় হবে তা নিরূপণ করা সহজ হতো না। কিন্তু দ্রব্যের লেনদেনে অর্থকে বিনিময়ের সাধারণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার ফলে সব ধরনের দ্রব্যসামগ্রী ও সেবা কাজের মূল্য পরিমাপ করা সহজ হয়েছে।
  3. সঞ্চয়ের সুবিধা: বিনিময় প্রথায় দ্রব্যের মাধ্যমে দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য সঞ্চয় করা অসুবিধাজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ফলে মূলধন গঠন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহজ ছিল না। আধুনিক কালে অর্থ সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে সহজ ও নিরাপদে সঞ্চয় করা যায়। এ সঞ্চয় থেকেই দেশে মূলধন গঠিত হয়, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে সাহায্য করে।
  4. ঋণের সুবিধাঃ বিনিময় প্রথায় দ্রব্যের মাধ্যমে ঋণ প্রদান ও পরিশোধ করা হত। কিন্তু দ্রব্যের মূল্য ও প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হয় বলে বিনিময় প্রথায় ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এর ফলে উৎপাদন ও ভোগও ব্যাহত হতো। কিন্তু আধুনিক যুগে অর্থের মাধ্যমে ঋণ ব্যবস্থা প্রচলনের ফলে উৎপাদন, ভোগ ও ব্যবসায়-বাণিজ্য সহজে সংঘটিত হচ্ছে।
  5. ভোগের সুবিধাঃ আধুনিক সমাজে যাবতীয় আয় আর্থিক আয়ের আকারে অর্জিত হয়। এ আর্থিক আয়ের মাধ্যমে মানুষ এমন এক ক্রয়ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে, যার ফলে তার ভোগের ক্ষেত্র অনেক অবাধ ও প্রসারিত হয়েছে। অর্থ চাহিদার তীব্রতা ও দ্রব্যের উপযোগ পরিমাপ করতে সাহায্য করে বলে অর্থের সাহায্যে প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুসারে দ্রব্য ও সেবা ভোগ এবং সর্বাধিক তৃপ্তি অর্জন করা যায়।
  6. উৎপাদনে সুবিধাঃ আধুনিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উৎপাদন শুরু হওয়া থেকে উৎপাদিত দ্রব্য বাজারজাতকরণ করা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে উৎপাদনকারীকে বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ ও ব্যবহার করতে হয়। অর্থের মাধ্যমেই এ কাজ করা সম্ভব। অর্থ বিনিয়োগকে উৎসাহিত এবং মূলধনকে গতিশীল করে। তা ছাড়া অর্থ প্রচলনের ফলে উৎপাদন ক্ষেত্রে শ্রম বিভাগ ও বিশেষীকরণ সম্ভব হয়েছে, যা বৃহদায়তন উৎপাদনে সহায়তা করে।
  7. ব্যবসায়-বাণিজ্যে সহায়তা: অর্থ ব্যবহারের কলে ব্যবসায়িক লেনদেন সহজ ও গতিশীল হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ, নিরাপদ ও পতিশীল হয়েছে। বস্তুত, অর্থ ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেন, পরিচালনা, দেনা-পাওনা পরিশোধ, দ্রব্যাদির মূল্য স্থানান্তর ইত্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয় বলেই আজকাল দেশে কিংবা বিদেশে বাবসা-বাণিজ্য করা এত সহজ ও নিরাপদ হয়েছে।
  8. অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সম্পদ বরাদ্দ: অর্থের মাধ্যমে দাম প্রক্রিয়া কার্যকর হয় এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্পদ বরাদ্দ করা হয়। অর্থনীতির কোনো খাতে কতটা সম্পদ বরাদ্দ করা হবে তার পরিমাণ মূলত অর্থের অঙ্কেই প্রকাশিত হয়।
  9. সরকারি আয়-ব্যয়: আধুনিক কালে সরকারি আয়-যায় অর্থের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। তাই সরকার তার আয়-ব্যয়ের মাধ্যমে উৎপাদন, নিয়োগ, বদীন, ভোগ ইত্যাদিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তা ছাড়া দেশের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা, জনকল্যাণ সাধন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ইত্যাদি কাজের জন্য বিপুল আয়-ব্যয় করতে হয়। একমাত্র অর্থের মাধ্যমেই তা করা সম্ভব।
  10. মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে: মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগসহ যাবতীয় অর্থনৈতিক কার্যাবলি সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে দাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সেখানে উৎপাদন, বাবসা-বাণিজ্য, ভোগ, দাম নির্ধারণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ডে অর্থ প্রধান চালিকাশক্তি রূপে কাজ করে।

উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, আধুনিক অর্থনীতিতে অর্থ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধনতান্ত্রিক পরিসরে অর্থ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এনেছে অচিন্তনীয় ব্যাপ্তি, জন্ম দিয়েছে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির।

অর্থনীতিবিদ ওয়াল্টন হেমিল্টন-এর বক্তব্য অনুযায়ী বলা যায়, আধুনিক কালের অর্থনীতিতে যে মহারূপান্তর ও বিশ্লষ সংঘটিত হয়েছে তার পেছনে রয়েছে মুদ্রা ব্যবস্থা, দাম ও বাজার প্রক্রিয়ার সুনিপুণ হাতের আশীর্বাদ। বস্তুত, অর্থনৈতিক কল্যাণের পুনর্বিন্যাসে অর্থ একটি শক্তিশালী উপকরণ।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। মুদ্রার মূল্যের সংজ্ঞা দাও | আধুনিক অর্থনীতিতে মুদ্রার গুরুত্ব আলোচনা কর এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url