অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব (Importance of Good Governance in Economic Field), বর্তমানে সুশাসনের যে ধারণাটি প্রচলিত আছে তা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য প্রণীত হয়েছিল। ১৯৭০-৭৮ সময়কালে আফ্রিকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১.৫ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে।

এ সময় আফ্রিকার বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ছিল মোট জাতীয় উৎপাদনের ৫ থেকে ৭ শতাংশ। হঠাৎ ১৯৮৪ সালের দিকে আফ্রিকায় প্রবৃদ্ধির হার নেমে আসে শূন্যের নিচে। ১৯৮৪-৯৭ সাল পর্যন্ত এ হার ছিল ০ থেকে ০.৫ শতাংশ। অথচ এ সময়ে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ জাতীয় উৎপাদনের ১০ থেকে ১৭ শতাংশের ঊর্ধ্বে উপনীত হয়।

বিদেশি সাহায্য প্রায় দ্বিগুণ করার পরও প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। আফ্রিকায় দ্রুত ধাবমান অর্থনৈতিক অধোগতির প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল 'শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্থার নীতি প্রণয়ন করে উন্নয়নের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্র গঠন বা State building করতে হবে যার জন্য প্রয়োজন সুশাসন।'

অর্থাৎ সুশাসনের উৎপত্তির সাথেই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। একটি রাষ্ট্র নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া, মধ্যম থেকে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের উপস্থিতির মাত্রার ওপর। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব অত্যধিক।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যষ্টিক, সামষ্টিক, আর্থিক নীতি, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শেয়ার বাজার, ব্যাংক, বিমা অর্থাৎ প্রায় সকল বিষয়েই দৃষ্টি রাখতে হয়। Etakula Vayunandan তার 'Good Governance Initiatives in India' গ্রন্থে দক্ষিণ এশিয়ার মানব উন্নয়ন রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে অর্থনৈতিক শাসনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। যেমন:

১. সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা,
২. সম্পদের অধিকারের নিশ্চয়তা,
৩. বাজার অর্থনীতির বিচ্যুতি দূরীকরণ,
৪. জনগণ ও মৌলিক অবকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগ,
৫. প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা,
৬. সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রগতিশীল এবং সমতাভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যতে ফুটে উঠা বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি সামগ্রিক সুশাসন অগ্রসর হবে।

বিশ্বব্যাংক সুশাসনের ছয়টি উপাদানকে চিহ্নিত করেছে। তার মধ্যে একটি হলো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। দুর্নীতির বিষয়টি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই বেশি হয়ে থাকে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সুশাসন বাস্তবায়ন। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতিসংঘ ২০০৩ সালে, 'United Nations Convention Against Corruption (UNCAC)' নামে একটি কনভেনশন প্রণয়ন করে।

উক্ত কনভেনশনে বলা হয়েছে যে, 'প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র তার আইনব্যবস্থার মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী কার্যকর এবং সমন্বিত দুর্নীতিবিরোধী নীতি প্রণয়ন করবে যা সমাজের অংশগ্রহণকে উন্নত করবে এবং আইনের শাসন, জনসম্পদ এবং জনসংযোগের উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা, সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিমূলক নীতির প্রতিফলন ঘটাবে।

এ কনভেনশনে দুর্নীতির প্রসারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বিবিধ অভ্যন্তরীণ ও পদ্ধতিগত দুর্বলতার সুযোগে দুর্নীতির প্রসার ঘটে। পদ্ধতিগত দুর্বলতাও কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক খাতগুলোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।

অর্থনৈতিক খাতের সুশাসন এত বেশি প্রয়োজনীয় যে বর্তমানে 'Corporate governance' নামে পৃথক একটি প্রপঞ্চ গড়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্পদের কাম্য ব্যবহার হলে সম্পদের সুষ্ঠু ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।  অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন জাতীয় আয় বৃদ্ধি ও তার সুষ্ঠু ন্যায়সংগত বণ্টন নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মাঝে আয় বৈষম্য হ্রাস পায়। অর্থনৈতিক সুশাসন রাষ্ট্রের উদ্যোক্তাদেরকে উৎসাহিত করে।

ফলে শিল্পের অগ্রগতি সাধিত হয়। পাশাপাশি বেকারত্ব হ্রাস পায়, জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং রাষ্ট্র অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করে। অর্থনৈতিক সুশাসন একচেটিয়া কারবার প্রতিরোধ করে, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করে এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সহায়তা করে। উক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব অপরিসীম।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url