রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব (Importance of Good Governance in Political Field), রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। সুশাসন ছাড়া কোনো রাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। তাই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিকাশের জন্য সুশাসন অপরিহার্য। নিচে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-

১. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের শাসন একান্ত কাম্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্রের পাশাপাশি সুশাসনেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান বলে গণ্য হবে এবং প্রত্যেক নাগরিকই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সামাজিক সাম্য, নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক সমাজ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে।

২. রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি: সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারী ও পুরুষের সম অংশগ্রহণ। UNDP এর মতে, অংশগ্রহণ মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ রাষ্ট্রের কার্যকারিতা এবং জনগণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বিশ্বব্যাংক বিশ্বাস করে যে, অংশগ্রহণ কার্যকারিতার উন্নয়ন ঘটায়। অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রকে অধিকতর ক্ষমতাশীল করা।

টেকসই মানবাধিকারের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সরকার, রাজনৈতিক সংগঠন এবং নাগরিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সঠিক পর্যায়ে না ঘটলে রাষ্ট্রীয় প্রগতি ও উন্নয়ন ব্যাহত হবে। তাই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা আবশ্যক। বর্তমান পৃথিবীতে দেখা যায়, যে সব রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি, সেখানে রাজনৈতিক অংশগ্রহণও বেশি হয় না।

৩. নাগরিকের মতামত গ্রহণ: নাগরিকের স্বাধীন মত প্রকাশ, উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরামর্শ দান প্রভৃতি সুশাসনের অন্যতম উপাদান। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য নাগরিকের মতামত গ্রহণের পথ উন্মুক্ত রাখা জরুরি। সুশাসন নাগরিককে মতামত দানে উৎসাহিত করে।

গণমাধ্যম, ইন্টারনেট, তথ্যদান, তথ্যপ্রাপ্তি, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, রেডিও, টেলিভিশন প্রভৃতির সাহায্যে মানুষ মতামত প্রকাশ করে থাকে। তাই নাগরিকের মতামত প্রকাশকে নিশ্চিত করার জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আবশ্যক। সুশাসন গণমাধ্যমকে স্বাধীনতা দিয়ে থাকে।

৪. জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: সুশাসনের অন্যতম লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। জবাবদিহিতা উন্নয়নের উদ্দেশ্য অর্জনে সহযোগিতা করে। মানুষের উন্নয়নের সাথে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা সম্পর্কিত। জবাবদিহিতা হলো সুশাসনের মূল চাবিকাঠি। শুধুমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়, বেসরকারি এবং সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই জনগণের নিকট জবাবদিহি করতে হবে।

এটিই সুশাসনের নীতি। সুশাসনের এ নীতিটি দুর্নীতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় আইন বিভাগের কাছে নির্বাহী বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের জবাবদিহি করানোর মাধ্যমে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। আইন বিভাগ বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখে।

৫. স্বচ্ছতা আনয়ন: যখন কোনো আইন ও নীতি মেনে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়ন করা হয় তখন তাকে স্বচ্ছতা বলে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব হলে সুশাসন কার্যকর হয় না। সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ হোক বা রাজনৈতিক অন্যান্য প্রতিষ্ঠানই হোক সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে প্রশাসনিক সব তথ্য যেমন নাগরিকরা জানতে পারে তেমনি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাসমূহের তথ্যও জানতে পারবে। এজন্য সবকিছুর আগে রাষ্ট্রে সুশাসন কার্যকর করা প্রয়োজন।

৬. বিকেন্দ্রীকরণ: বিকেন্দ্রীকরণ বলতে শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রত্যার্পণ নয়, একই সাথে আর্থিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব অর্পণকেও বোঝানো হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারি এবং অন্যান্য কার্যাবলি পরিচালনা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পক্ষে সম্ভব হয় না।

এজন্য কিছু কিছু ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে ছেড়ে দিতে হয় বলে প্রশাসনিক কার্যাবলি দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। বিকেন্দ্রীকরণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা পূরণ সহজতর হয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়। বিকেন্দ্রীকরণ সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

৭. স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার অনুপস্থিতি: স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার অনুপস্থিতি সুশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ক্ষমতা যখন দীর্ঘায়িত হয় তখনই স্বেচ্ছাচারিতার সৃষ্টি হয়। সুশাসন স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাকে অনুমোদন করে না। সুশাসন থেকে দূরে রয়েছে যে সব রাষ্ট্র সেগুলোর প্রত্যেকটির রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার উপস্থিতি। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে এটি বেশি দেখা যায়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার বিলুপ্তি ঘটানো যেতে পারে।

৮. দলীয়করণ: দলীয়করণ সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম অন্তরায়। দলীয়করণের সংস্কৃতিতে অযোগ্য-অদক্ষরাই লাভবান হয় এবং যোগ্য-দক্ষ ও নিরপেক্ষরা বঞ্চিত হয়। ফলে সরকারের কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না।

নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যোগ্যতা-দক্ষতা বিবেচনায় না নেওয়া এবং পক্ষপাতিত্বের ফলে জনপ্রশাসন মেধাশূন্য হয়ে পড়ে। বস্তুত লাগামহীন দলীয়করণের ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ভবিষ্যতে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এজন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োজন সুশাসন যা দলীয়করণের পরিবর্তে মেধা-দক্ষতা-যোগ্যতার মূল্যায়নের সুযোগ করে দেবে।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url