বাংলাদেশে জাতীয় আয় পরিমাপের সমস্যাবলি আলোচনা কর

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে বাংলাদেশে জাতীয় আয় পরিমাপের সমস্যাবলি আলোচনা কর নিয়ে আলোচনা করব।

বাংলাদেশে জাতীয় আয় পরিমাপের সমস্যাবলি আলোচনা কর

বাংলাদেশে জাতীয় আয় পরিমাপের সমস্যাবলি আলোচনা কর। অথবা, জাতীয় আয় পরিমাপের সমস্যা ও সমাধানসমূহ বর্ণনা কর। জাতীয় আয় পরিমাপে সমস্যাঃ মতো অনুন্নত দেশে জাতীয় আয় পরিমাপের ক্ষেত্রে কতকগুলো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এসব সমস্যা আমাদের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে বাধাগ্রস্ত করে থাকে। বাংলাদেশের জাতীয় আয় পরিমাপের প্রধান সমস্যাগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ

  1. সঠিক তথ্য ও পরিসংখ্যানের অভাবঃ বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে জাতীয় আয় পরিমাপের প্রধান সমস্যা হলো নির্ভরযোগ্য তথ্য ও পরিসংখ্যানের অভাব। জাতীয় আয় সঠিকভাবে পরিমাপ করতে হলে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের বিশেষ প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে সঠিক ও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে জাতীয় আয় নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয় না।
  2. শিক্ষার অভাবঃ বাংলাদেশের মতে। অনুন্নত দেশে জাতীয় আয় পরিমাপের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো শিক্ষার অভাব। বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক অশিক্ষিত। তারা উৎপাদনের সঠিক হিসাব রাখে না। উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রীর সঠিক হিসাব না রাখার দরুন জাতীয় আয়ের নির্ভুল গণনা সম্ভব হয় না।
  3. দ্বৈত গণনাজনিত সমস্যাঃ বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে মাধ্যমিক ও চূড়ান্ত দ্রব্যের মধ্যে সঠিকভাবে পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। ফলে জাতীয় আয়ের সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। যেমন- কাগজের মূল্য যদি একবার পৃথকভাবে হিসাব করা হয়, আবার বইয়ের মাধ্যমেও কাগজের মূল্য ধরা হয় তাহলে কাগজের মূল্য দু'বার গণনা করা হলো। এভাবে কোনো দ্রব্যের মূল্য একাধিকবার জাতীয় আয় হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হলে জাতীয় আয় সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায় না।
  4. পারিবারিক খাতে ভোগঃ অনেক সময় উৎপাদনকারিগণ তাদের উৎপাদিত দ্রব্যের কিছু অংশ নিজেরাই ভোগ করে। এসব দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য অর্থের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় না বলে তা জাতীয় আয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। বাংলাদেশে বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন ক্ষেত্রে এ সমস্যা দেখা যায়। এর ফলে জাতীয় আয়ের সঠিক পরিমাপ সম্ভব হয় না।
  5. ক্ষয়ক্ষতিজনিত ব্যয় নির্ধারণঃ জাতীয় আয় গণনার সময় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য স্থায়ী মূলধনের ক্ষয়ক্ষতিজনিত খরচ বাদ দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য মূলধন দ্রব্যের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। ফলে জাতীয় আয়ের সঠিক গণনা করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
  6. অনুন্নত বাজার ব্যবস্থাঃ বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা অনুন্নত ও অসংগঠিত। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রীর বিশেষ করে কৃষিজ পণ্যের দামের ব্যাপক তারতম্য লক্ষ করা যায়। এর ফলে জাতীয় আয় সঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয় না।
  7. কৃষি ও শিল্প সংগঠিত: বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা সুসংগঠিত ও সংঘবদ্ধ নয়। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উৎপাদন কার্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প বা ছোট ছোট কৃষক পরিবার দ্বারা ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে পরিচালিত হয়। ফলে জাতীয় আয় পরিমাপ করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
  8. দ্রব্য বিনিময়জনিত সমস্যাঃ জাতীয় আয় গণনার সময় সাধারণত অর্থের বিনিময়ে সংঘটিত কার্যাবলি হিসাব করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিশেষ করে পল্লি অঞ্চলে এখনও অনেক ক্ষেত্রে দ্রব্য বিনিময়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়। যেমন- আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাজের জন্য চাল বা অন্য কোনো দ্রব্যসামগ্রী প্রদান করা হয়। এসব কাজের জন্য অর্থ প্রদান করা হয় না বলে তা জাতীয় আয় হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে জাতীয় আয়ের সঠিক পরিমাপ করা সম্ভব হয় না।
  9. কর ফাঁকির প্রবণতা: বাংলাদেশে অধিকাংশ লোক অশিক্ষিত বলে তারা যথেষ্ট দায়িত্বশীল নয়। আমাদের দেশে জনসাধারণ কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে অনেক সময় তাদের প্রকৃত আয় গোপন রাখে। ফলে জাতীয় আয় সঠিকভাবে গণনা করা যায় না।
  10. পেশাগত বিশেষীকরণের অভাবঃ বাংলাদেশে পেশাগত বিশেষীকরণের অভাব রয়েছে। আমাদের দেশে উৎপাদনকারিগণ একই সাথে বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত থাকে। উৎপাদন ক্ষেত্রে বিশেষীকরণ নীতি অনুসৃত না হওয়ায় জাতীয় আয় সঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের জাতীয় আয় গণনার ক্ষেত্রে এসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এজন্য বাংলাদেশে জাতীয় আয় সঠিকভাবে পরিমাপ করা খুবই কঠিন। জাতীয় আয় পরিমাপে সমস্যার সমাধানঃ জাতীয় আয় পরিমাপের সমস্যার সমাধানগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো-

  1. সঠিক তথ্যের ব্যবহার (Use of Correct Data): জাতীয় আয় গণনার ক্ষেত্রে যে-সকল তথ্য ব্যবহার করা হয় তা অনেকটা সম্ভাবনানির্ভর বা নমুনার মাধ্যমে সংগৃহীত। এরূপ তথ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমগ্র দেশের প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে এরূপ তথ্য হতে জাতীয় আয়ও সঠিক হয় না। তাই সঠিকভাবে জাতীয় আয় নির্ণয়ের জন্য সঠিক ও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করে তা ব্যবহার করতে হবে।
  2. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিবেচনা (Considering International Trade): আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও জাতীয় আয় পরিমাপের জটিলতা সৃষ্টি করে। যেমন, আমদানি-রপ্তানি পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণ করে নিট পাওনা জাতীয় আয়ের সাথে যোগ করতে হয় আর নীট দেনা জাতীয় আয় থেকে বাদ দিতে হয়। এগুলো সঠিকভাবে করা হলে জাতীয় আয় পরিমাপ সঠিক হবে।
  3. হস্তান্তর পাওনাসমূহ পরিহার (Avoidance of Transferable Payments): জাতীয় আয় সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য হস্তান্তর পাওনাসমূহ বাদ দেওয়া প্রয়োজন। সমাজের অনেক লোক আছে, যারা কোনো কিছু উৎপাদন না করেই কিছু আয় করে। এ সকল শ্রেণির লোকের আয় যাতে আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  4. মূল্যের উঠানামা বিবেচনা (Considering Fluctuation of Price): বিভিন্ন কারণে দ্রব্য মূল্য প্রায় উঠানামা করে। এটা জাতীয় আয় পরিমাপে জটিলতা সৃষ্টি করে। তাই জাতীয় আয় পরিমাপের সময় মূল্যের উঠানামা বিবেচনা করতে হবে।
  5. বিশেষীকরণ সৃষ্টি (Creation of Specialization): জাতীয় আয় নির্ধারণে বিশেষীকরণের অভাব একটি বড় বাধা। দেশে এমন অনেক লোক আছে, যারা একই সঙ্গে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকে। ফলে, তারা কোনো কাজেই বিশেষজ্ঞতা অর্জন করতে পারে না। এ কারণে প্রতি খাতে তার আয় নির্ণয় করা কঠিন হয়। এ সমস্যা দূরীকরণে প্রতিটি কাজের বিশেষীকরণ করতে হবে।
  6. অবিক্রিত পণ্য বিবেচনা (Considering Unsold Goods): নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণত এক বছরে জাতীয় আয় পরিমাপ করা হয়। এ সময় উৎপাদিত সকল পণ্য বছর শেষে বিক্রয় হয় না। অবিক্রিত পণ্যকে জাতীয় আয় পরিমাপের সময় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  7. দ্বৈত গণনা পরিহার (Avoidance of Double Counting): জাতীয় আয় গণনার একটি অন্যতম অসুবিধা বা সমস্যা হলো দ্বৈত গণনা। দ্বৈত গণনা বলতে একই জিনিসের একাধিকবার গণনাকে বুঝায়। এর ফলে প্রকৃত জাতীয় আয় হতে গণনাকৃত জাতীয় আয় অধিক হয়। তাই প্রকৃত জাতীয় আয় নিরূপণে এরূপ দ্বৈত গণনা পরিহার করতে হবে।
  8. অবৈধ কার্যকলাপ পরিহার (Avoidance of Illegal Activities): অবৈধ কার্যক্রমের ফলেও দেশে প্রচুর আয় সৃষ্টি হয়। যেমন- মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, ঘুষ প্রভৃতি। জাতীয় আয় পরিমাপের ক্ষেত্রে অবৈধ আয় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
  9. সঠিকভাবে আর্থিক মূল্য নিরূপণ (Correct6 Determination of Financial Value): জাতীয় আয় নিরূপণের ক্ষেত্রে দেশের সকল আর্থিক কাজের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। যেমন- গ্রামাঞ্চলে অনেক কাজ আছে, যার বিনিময়ে অর্থ না দিয়ে দ্রব্য দেয়া হয়। কিন্তু জাতীয় আয় নিরূপণে এ বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হয় না। তাই এগুলোকে সঠিকভাবে বিবেচনা করে আর্থিকমূল্য নিরূপণ করতে হবে।
  10. মূলধনের অবচয় ও কর পরিহার (Avoidance of Capital Depreciation and Tax): উৎপাদন কাজ পরিচালনার সময় অবচয় হয়। আবার পরোক্ষ কর আরোপ করা হলে পণ্যের বিক্রয়মূল্য বেড়ে যায়। তাই এ ধরনের অবচয় ও পরোক্ষ কর বাদ দিয়ে জাতীয় আয় পরিমাপ করতে হয়।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। বাংলাদেশে জাতীয় আয় পরিমাপের সমস্যাবলি আলোচনা কর এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url