প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তু ও উপাদান

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তু ও উপাদান নিয়ে আলোচনা করব।

প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তু (Subject matter of Physical Geography) প্রাকৃতিক ভূগোল ভূগোলশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। প্রাকৃতিক ভূগোলের মূল আলোচ্য বিষয় হলো প্রাকৃতিক বিষয়াদি। পৃথিবীর প্রধান উপাদান হিসেবে মানুষ ও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যায় প্রাকৃতিক ভূগোল থেকে।

প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তু ও উপাদান

পৃথিবীর জলভাগ, স্থলভাগ ও বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক অবস্থা অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের সকল বিষয়ের ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়ার অবস্থার সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায় প্রাকৃতিক ভূগোলে। প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তুগুলোকে প্রধানত তিনটি বিশেষ শ্রেণিবিভাগের মাধ্যমে আলোচনা করা যায়। যথা- (ক) অশ্মমণ্ডল, (খ) বায়ুমণ্ডল ও (গ) বারিমণ্ডল।

(ক) অশ্মমণ্ডল: ভূপৃষ্ঠের শক্ত বহিরাবরণকেই অশামণ্ডল বলে। অশ্মমণ্ডল প্রায় ১২৮০ থেকে ১৬০০ কিলোমিটার গভীর। কঠিন আবরণে গঠিত অশ্মমণ্ডলকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়- ভূত্বক (Crust) ও ভূত্বকের নিম্নাংশ (Substratum)। অশ্মমণ্ডলের উপরিভাগ যত কঠিন নিম্নাংশ তত কঠিন নয়। সাম্প্রতিককালে অর্থাৎ বিংশ শতাব্দী থেকে আরও একটি জৈব পরিবেশ হিসেবে অশামণ্ডলের ওপর গড়ে উঠেছে, যা জীবমণ্ডল নামে পরিচিত। অশ্মমণ্ডলের অন্তর্গত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিম্নরূপ-

  1. ভূঅভ্যন্তর: পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন প্রক্রিয়া, উপাদান প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
  2. খনিজ ও শিলা: শিলা ও খনিজের উৎপত্তি, গঠন, বণ্টন, ধর্ম, বৈশিষ্ট্য এবং শিলার শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
  3. ভূআলোড়ন: ভূআলোড়নের কারণ, শ্রেণিবিভাগ, ভূআলোড়নের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রকার ভূমিরূপ, পর্বত, মালভূমি এবং সমভূমির গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
  4. ভূমিকম্প: ভূমিকম্পের সংজ্ঞার্থ, ভূমিকম্পের কারণ, ফলাফল, সৃষ্ট ভূমিরূপ ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
  5. নদ-নদী: নদ-নদীর উৎপত্তি, গতিপথ, ক্রমবিকাশ, শ্রেণিবিভাগ, নদীবিন্যাস, নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নদীর ক্ষয় ও ক্ষয়জাত ভূমিরূপ সঞ্চয় ও সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ প্রভৃতি বিষয়সমূহ প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তুর অন্তর্গত।
  6. বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক পরিবর্তন: বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক পরিবর্তন, পরিবর্ধনের মাধ্যম বা প্রক্রিয়া যেমন- আগ্নেয়গিরি, বিচূর্ণীভবন, নগ্নীভবন, ক্ষয়ীভবন, সঞ্চয় প্রভৃতি প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত।

(খ) বায়ুমণ্ডল: আমাদের এ পৃথিবী নানাপ্রকার গ্যাসীয় উপাদান দ্বারা পরিবেষ্টিত। এসব গ্যাসীয় উপাদানের সাধারণ নাম বায়ু (Air)। অর্থাৎ যে অদৃশ্য বায়ুরাশি পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে তাই বায়ুমণ্ডল। বায়ুমণ্ডলের বয়স প্রায় ৩৫ কোটি বছর। নিচে বায়ুমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ উল্লেখ করা হলো:

১. বায়ুর উপাদান ও বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস: বায়ুর উৎপত্তি, বায়ুর উপাদানসমূহ, বায়ুর ধর্ম, তাপ, চাপ, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুপ্রবাহের শ্রেণিবিভাগ, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচ্য বিষয়। ২। জলবায়ু : আবহাওয়া ও জলবায়ু, আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদান, পার্থক্য, শ্রেণিবিভাগ, জলবায়ুর নিয়ামক, বিভিন্ন প্রকার জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য, মানবজীবনে জলবায়ুর প্রভাব, জলবায়ুর পরিবর্তন ইত্যাদি প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

(গ) বারিমণ্ডল: পৃথিবীর বায়বীয় অবস্থা হতে বর্তমান অবস্থায় রূপান্তরের সময় ভূআন্দোলনের ফলে ভূপৃষ্ঠ অসমানভাবে সংকুচিত হয়েছে। ফলে ভূপৃষ্ঠের কিছু অংশ বেশ উঁচু এবং কিছু অংশ অনেকটা নিচু হয়েছে। ভূপৃষ্ঠের এ উন্নত অংশসমূহ স্থলমণ্ডল এবং পানি সঞ্চিত অবনত অংশকে বারিমণ্ডল বলে। বারিমণ্ডল প্রাকৃতিক ভূগোলের একটি অন্যতম আলোচ্য বিষয়। নিচে বারিমণ্ডলের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর বিবরণ দেওয়া হলো: 

১। জল ও স্থলভাগের অবস্থান জল ও স্থলভাগের অবস্থান, বিন্যাসের বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় প্রাকৃতিক ভূগোলের এ অংশে।

২. সাগর-মহাসাগর: সাগর-মহাসাগরের অবস্থান, আয়তন, গভীরতা, আকার-আকৃতি ইত্যাদি বিষয় প্রাকৃতিক ভূগোলের এ অংশের অন্তর্ভুক্ত।

৩। সমুদ্রস্রোত : সমুদ্রস্রোত, সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি, কারণ, শ্রেণিবিভাগ, গতিপথের বিবরণ, বিভিন্ন সাগর - মহাসাগরের স্রোত, মানবজীবনে সমুদ্রস্রোতের প্রভাব ইত্যাদি।

৪. সমুদ্রতলের ভূপ্রকৃতি: বিভিন্ন সাগর-মহাসাগরের তলদেশের প্রকৃতি, ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিভাগ, মানব- জীবনে ভূপ্রকৃতির বা ভূমিরূপের গুরুত্ব প্রাকৃতিক ভূগোলের এ অংশে আলোচনা করা হয়।

৫. জোয়ার-ভাটা: জোয়ার-ভাটা, জোয়ার-ভাটার কারণ, শ্রেণিবিভাগ, ফলাফল, বান, সুনামি ইত্যাদি প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচ্য বিষয়।

প্রাকৃতিক ভূগোলের উপাদান (Elements of Physical Geography)

প্রাকৃতিক পরিবেশের সব উপাদানই প্রাকৃতিক ভূগোলের উপাদান হিসেবে পরিচিত। নিচে প্রাকৃতিক ভূগোলের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপাদানের বিবরণ দেওয়া হলো:

১. ভূপ্রকৃতি: ভূপ্রকৃতি প্রাকৃতিক ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোনো অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বণ্টন ধরন সে এলাকার ভূপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। ভূপ্রকৃতি পর্বতময়, মালভূমি বা সমভূমি হয়ে থাকে।

২. ভৌগোলিক অবস্থান: প্রাকৃতিক ভূগোলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর একটি উপাদান হলো ভৌগোলিক অবস্থান। ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি বা অবনতি।

যেমন- অতিরিক্ত তাপ ও বৃষ্টিপাতমুক্ত উষ্ণমণ্ডলে অবস্থিত দেশসমূহ কৃষিকাজে তেমন উন্নত নয়। আবার প্রচুর শীতের জন্য হিমমণ্ডল কৃষিকাজের জন্য উপযোগী নয়। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অনুকূল জলবায়ুর জন্য সেখানকার দেশগুলো কৃষি উপযোগী এবং বিভিন্ন ধরনের কৃষিব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

৩. নদ-নদী: প্রাকৃতিক ভূগোলের উপাদান হিসেবে নদ-নদীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নদ-নদীর ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে কৃষিব্যবস্থা। কৃষিকাজের সেচব্যবস্থা ছাড়াও উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ এবং যাতায়াত ব্যবস্থায় নদীপথের গুরুত্ব অধিক। যে কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে এ দেশের বড় বড় নদী যেমন- পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, কর্ণফুলী প্রভৃতির গুরুত্ব অপরিসীম।

৪. মৃত্তিকা : মৃত্তিকার উর্বরতা বা অনুর্বরতার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে কৃষিব্যবস্থা। যেসব এলাকার মৃত্তিকা উর্বর সেসব এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়। যেমন- গাঙ্গেয় সমভূমির মৃত্তিকা পলি দ্বারা গঠিত হওয়ায় অত্যন্ত উর্বর আর এ কারণেই এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। পক্ষান্তরে, মালভূমি এলাকার অধিবাসীরা কৃষির ওপর নির্ভরশীল নয়।

৫. জলবায়ু: জলবায়ু প্রাকৃতিক ভূগোলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। কোনো দেশ বা অঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যাবলি নির্ভর করে সে দেশের জলবায়ুর ওপর। কৃষি উপযোগী অনুকূল জলবায়ু অঞ্চলে গড়ে ওঠে কৃষিব্যবস্থা। আবার শিল্প, কলকারখানা উপযোগী জলবায়ু অঞ্চলে গড়ে ওঠে শিল্পব্যবস্থা। মানুষের যেসব কর্মকাণ্ডের ওপর জলবায়ুগত প্রভাব বিশেষভাবে দেখা যায় সেগুলো হলো- কৃষিকার্য, পরিবহন ব্যবস্থা, বাসস্থান ও এর ধরন, নির্মাণ উপকরণ, শিল্পকারখানা ইত্যাদি।

৬. প্রাকৃতিক উদ্ভিদ: প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জও প্রাকৃতিক ভূগোলের একটি অন্যতম উপাদান। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান সবকিছুর জন্য মানুষ উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে। শুধু তাই নয় উদ্ভিজ্জ মানুষকে পরোক্ষভাবেও সহায়তা করে। যেমন পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখতে, বৃষ্টিপাতের সহায়তা করতে, ভূমির ক্ষয়রোধে, সর্বোপরি মানুষের জীবনধারণে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহে উদ্ভিদের ভূমিকা অপরিসীম।

৭. খনিজ সম্পদ : খনিজ সম্পদ প্রাকৃতিক ভূগোলের আর একটি বিশেষ উপাদান। কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে খনিজ সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নতির অন্যতম কারণ খনিজ সম্পদে প্রাচুর্যতা। খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, রাশিয়া প্রভৃতি দেশ ব্যাপক উন্নতি করছে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নতি সম্পূর্ণভাবে খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে খনিজ সম্পদও প্রাকৃতিক ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

৮. প্রাণিজগৎ: মানুষের অর্থনৈতিক কার্যাবলিতে প্রাণিজগৎ নানাভাবে সহায়তা করে থাকে। যেমন- মানুষের প্রয়োজনীয় মাছ, মাংস, ডিম প্রভৃতি প্রাণিজগৎ থেকেই পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় বিভিন্ন প্রাণির চামড়া শিল্পকারখানায় ব্যবহার করে মানুষের প্রয়োজনীয় দ্রব্য তৈরি করা হয়। আবার পরিবহন ও কৃষিকাজে এখন গরু, মহিষ, ঘোড়া ব্যবহার করা হয় বহুদেশে। ফলে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণিজগতের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তু ও উপাদান এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url