পলাশীর যুদ্ধ: বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে পলাশীর যুদ্ধ: বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা করব।

পলাশীর যুদ্ধ: বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা

পলাশীর যুদ্ধ: বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা - Battle of Plassy and the establishment of Kingdom of East India Company in Bengal. নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবি মসনদে আরোহণ করেন।

প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকরা সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে উপহার-উপঢৌকন প্রদানসহ তাঁকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করলেও ইংরেজরা তা করেনি। এছাড়াও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কৃষ্ণ বল্লভসহ নবাবের অবাধ্য কর্মচারীদেরকে আশ্রয় প্রদান করে নবাবের সাথে প্রত্যক্ষ বিরোধিতা শুরু করেন।

এসব অন্যায় কাজ বন্ধ করার জন্য নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর ড্রেককে নির্দেশ প্রদান করলে তিনি তা উপেক্ষা করেন। এ সময় ইংরেজরা নবাবের আদেশ অমান্য করে কলিকাতায় দুর্গ নির্মাণ করতে শুরু করে।

অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে শাস্তিদানের উদ্দেশ্যে নবাব ১৭৫৬ সালের ৪ জুন কাশিমবাজার কুঠি অধিকার করেন এবং কলিকাতা অভিমুখে অগ্রসর হন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর ড্রেক তাঁর পরিষদের সদস্য ও অন্যান্য ইংরেজদেরকে নিয়ে জাহাজে আশ্রয় গ্রহণ করেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা বীরদর্পে ১৭৫৬ সালের ২০ জুন কলিকাতা দখল করেন। নবাব তাঁর অন্যতম সেনাধ্যক্ষ মানিকচাঁদের উপর কলিকাতার শাসনভার অর্পণ করে মুর্শিদাবাদে প্রত্যাবর্তন করেন।

এরপর শুরু হয় নবাবের বিরুদ্ধে তাঁর অমাত্যবর্গের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। উমিচাঁদের উদ্যোগে মীরজাফর আলী খান, রাজা রায়দুর্লভ, রাজা রাজবল্লভ, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এজেন্ট ওয়াটসন প্রমুখ জগৎশেঠের বাসভবনে এক গোপন বৈঠকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহযোগিতায় নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার এবং মীরজাফরকে নবাবি মসনদে বসানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা এ গোপন ষড়যন্ত্র ও চুক্তির কথা জানতে পেরে মীরজাফর আলী খানকে প্রধান সেনাপতি ও বশীর পদ হতে অপসারিত করে আবদুল হাদী খানকে সে পদে নিয়োগ করেন। বিচক্ষণ, নবাবভক্ত ও দেশপ্রেমিক সভাসদ ও সেনানায়কদের নিষেধ সত্ত্বেও জগৎশেঠ প্রমুখের পরামর্শে এবং মীরজাফর আলী খান কর্তৃক পবিত্র কুরআন শরীফ স্পর্শ করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে নবাব পুনরায় মীরজাফর আলী খানকে প্রধান সেনাধ্যক্ষ ও বণী পদে নিয়োগ করেন।

রবার্ট ক্লাইভ তার সেনাবাহিনীসহ মুর্শিদাবাদ আক্রমণে অগ্রসর হলে বিশ্বাসঘাতক সেনাধ্যক্ষ মীরজাফরের গোপন আদেশের ফলে হুগলি ও কাটোয়ার ফৌজদাররা বাধা প্রদান করেনি। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ক্লাইভকে বাধাদানের উদ্দেশ্যে পলাশীর প্রান্তরে উপস্থিত হন।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ শুরু হলে মোহনলাল, মীরমদন ও সিনফ্রের আক্রমণে ক্লাইভের সৈন্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সময় ইংরেজ সেনাদের নিক্ষিপ্ত গুলিতে মীরমদন নিহত হলে শোকাতুর নবাবকে সান্ত্বনা দেওয়ার ছল করে মীরজাফর সেদিনের মতো নবাবকে যুদ্ধ স্থগিত রাখার পরামর্শ প্রদান করেন।

মোহনলাল ও সিনফে নবাবকে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার পরামর্শ প্রদান করেন। কেননা ক্লাইভের সৈন্যগণ তখন পশ্চাৎপদ হয়ে আম্রকুঞ্জের আড়ালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের অনুরোধ সত্ত্বেও নবাব সিরাজউদ্দৌলা মীরজাফরের পরামর্শ অনুযায়ী সেদিনের মতো যুদ্ধ। বন্ধ করার আদেশ প্রদান করেন।

বিজয়ের মুখে যুদ্ধ বন্ধ করার এ আদেশ নবাব সৈন্যদেরকে নিরুৎসাহিত করে তোলে। ধৃর্ত রবার্ট ক্লাইভ এ সুযোগে এবং বিশ্বাসঘাতক সেনাধ্যক্ষ মীরজাফরের ইঙ্গিতে নবাবের বাহিনীকে আক্রমণ করে বসেন। এর ফলে মীরজাফরের আদেশে নবাবের সেনাবাহিনী ক্লাইভের বাহিনীকে বাধা না দিয়ে নিষ্ক্রিয় থাকে।

সেনাধ্যক্ষ মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর প্রান্তরে অনেকটা বিনাযুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভ জয়লাভ করেন। পরাজিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা সৈন্য সংগ্রহের আশায় পাটনার উদ্দেশ্যে রাজমহলের পথে যাত্রা করেন। কিন্তু পথিমধ্যে মীরজাফরের জামাতা মীর কাশিম কর্তৃক নবাব ধৃত হন।

ধৃত নবাবকে মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসা হয়। মীরজাফরের দুশ্চরিত্র পুত্র মীরনের আদেশে প্রচুর বখশিস পাবার লোভে মোহাম্মদী বেগ (নবাব আলীবর্দী খাঁ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার আশ্রয় ও দয়ায় মোহাম্মদী বেগ নবাব প্রাসাদেই মানুষ হয়েছিলেন এবং সেখানেই থাকতেন) ১৭৫৭ সালের ২৯ জুন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন।

নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যার পর বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর আলী খান সেদিনই বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব হন। পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সাল থেকে ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত 'নবাব' নামধারী মীরজাফরের বংশধর কয়েকজন। সাক্ষীগোপাল শাসককে সম্মুখে রেখে প্রকৃত শাসন চালাতে থাকে। ইংরেজরাই পর্দার অন্তরালে হয়ে পড়েন নবাব-নির্মাতা বা প্রকৃত নবাব।

বিশ্বাসঘাতকতার পুরষ্কারস্বরূপ ইংরেজদের সহযোগিতায় মীরজাফর নবাব হয়ে ইংরেজদের সাথে পূর্বের গোপন চুক্তি মোতাবেক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চব্বিশ পরগণার জমিদারি প্রদান করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নবনিযুক্ত গভর্নর ভেন্সিটার্ট গায়ের জোরে মীরজাফরকে সরিয়ে মীর কাশিমকে নবাবের সিংহাসনে বসান।

নতুন নবাব গোপন চুক্তির শর্তানুযায়ী ইংরেজদের বকেয়া পাওনা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন এবং ১৭৬০ সালে মেদিনীপুর, বর্ধমান ও চট্টগ্রাম-এ জেলা তিনটির জমিদারিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই মীর কাশিমের সাথে ইংরেজদের বিরোধিতা এমনকি ১৭৬৩ সালে যুদ্ধও শুরু হয়।

১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর মীর কাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্ আলমের মিলিত সেনাবাহিনী বক্সারের যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর নিকট পরাজয় বরণ করে। এ যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই ইংরেজরা মীরজাফরকে দ্বিতীয়বার বাংলার নবাব বলে ঘোষণা করে।

১৭৬৫ সালে মীরজাফরের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র নজমুদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে অপমানকর সন্ধি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলার নবাব হন। ১৭৬৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির এ অপমানজনক সন্ধির শর্তানুযায়ী বাংলার পূর্ণ শাসন ক্ষমতা নবাবের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে 'নায়েবে নাজিম' নামক একজন মন্ত্রীর হাতে অর্পণ করা হয়।

নায়েবে নাজিম' ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক মনোনীত হতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ সালে বছরে ছাব্বিশ লক্ষ টাকা দেওয়ার বিনিময়ে মুঘল সম্রাটের নিকট থেকে এক ফরমানবলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা অর্থাৎ 'দেওয়ানি সনদ' লাভ করেন।

এভাবেই ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বিজয় অর্জন ও ১৭৬৫ সালে রাজস্ব আদায়ের আইনসঙ্গত অধিকার বা দেওয়ানি লাভ করে। কূটবুদ্ধি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্লাইভ বাংলার তথা ভারতের মাটিতে ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে মজবুত করতে সমর্থ হন। তারই উদ্যোগ, চাতুর্য ও কূটবুদ্ধিতে 'ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির' মতো একটি বিদেশি বেনিয়া কোম্পানি অতি দ্রুত এদেশের শাসকশ্রেণিতে পরিণত হয়।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। পলাশীর যুদ্ধ: বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url