সুশাসনের ক্রমবিকাশ - Evolution of Good Governance

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে সুশাসনের ক্রমবিকাশ - Evolution of Good Governance নিয়ে আলোচনা করব।

সুশাসনের ক্রমবিকাশ - Evolution of Good Governance

সুশাসনের ধারণা প্লেটোর লেখনিতেও পাওয়া যায়। ইংরেজি গভর্নেন্স শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ 'কুবেরনাও' (Kubernao) থেকে। এ শব্দটি সর্বপ্রথম রূপক অর্থে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ব্যবহার করেছিলেন। তাছাড়া রাষ্ট্র সম্পর্কে প্লেটো বলেছিলেন- 'রাষ্ট্র হবে ন্যায়ভিত্তিক ও আদর্শ।

ন্যায়ভিত্তিক আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা গেলে জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হবে।' প্লেটোর এ বক্তব্যের মধ্যেও সুশাসনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সুশাসন বিষয়টির ধারণা এরিস্টটলের লেখনি থেকেও পাওয়া যায়।

এরিস্টটল বলেছিলেন, 'সর্বোৎকৃষ্ট কল্যাণসাধন রাষ্ট্রের লক্ষ্য।' তিনি আরও বলেছিলেন, 'প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক উপায়ে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু রাষ্ট্র টিকে আছে উন্নত জীবন অব্যাহত রাখার জন্য।' এরিস্টটল বর্ণিত উন্নত জীবন (Good life) কথাটি যদি ভালোভাবে অনুধাবন করি তাহলে বুঝব বর্তমানের সুশাসন প্রত্যয়ের মধ্যেও এটি নিহিত আছে। উন্নত জীবন কামনার মধ্য দিয়েই শুরু হয় জীবন রক্ষার নিশ্চয়তা, স্বাধীনতা, সাম্য।

প্রভৃতি বিষয়। এরিস্টটল তার সংবিধানের আলোচনার মাধ্যমেও সুশাসনের বিষয়টিকে তুলে ধরেন। তিনি সংবিধানকে প্রকৃতিগত দিক থেকে দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। তার মতে, 'যে শাসন শুধু শাসকের স্বার্থে পরিচালিত না হয়ে সমাজের সাধারণ স্বার্থে (Common Good) পরিচালিত হয় তা হলো শুদ্ধ প্রকৃতির সংবিধান (The True Constitution)।

আর যে শাসন সমাজের স্বার্থকে উপেক্ষা করে শুধু শাসকের দ্বার্থকেই প্রাধান্য দেয় তা বিকৃত প্রকৃতির সংবিধান (The Parverted Constitution)। প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিত কৌটিল্য তার 'অর্থশাস্ত্র' নামক গ্রন্থে সুশাসন সম্পর্কে আলোকপাত করেছিলেন।

তিনি সুশাসন বলতে আইনের শাসন, জনবান্ধব প্রশাসন, যৌক্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনকে বুঝিয়েছিলেন। পরবর্তীতে টমাস হবস (Thomas Hobbes), জন লক (John Locke) ও জাঁ অ্যাঁক বুশোর (Jean Jacques Rousscau) রাষ্ট্রের উৎপত্তির সামাজিক চুক্তি মতবাদের মধ্যেও সুশাসনের প্রতিফলন দেখতে পাই।

এক্ষেত্রে জন লক-এর বক্তব্যের উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, 'মানুষের প্রাকৃতিক অধিকারসমূহের সংরক্ষণ ও যথাযথ বিকাশের জন্যই যেহেতু সরকারের জন্ম, সেহেতু কোনো সরকার যদি জনগণের উত্ত অধিকারসমূহ সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সেক্ষেত্রে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার বৈধ অধিকার জনগণের রয়েছে। জন লকের এ বক্তব্যের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রের ধারণা, সম্প্রীতির ভিত্তিতে শাসন এবং সুশাসনভিত্তিক সরকারের ধারণা তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সমাজের বিকাশ ও সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে উন্নত জীবন (Good Life) এর শর্তসমূহেরও বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। উন্নত জীবনের শর্তসমূহ রাষ্ট্রসমূহের সংবিধান বিধিবদ্ধ আইনের আওতায় আসে এবং এগুলো সরকারের জন্য অবশ্যই পালনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির ওপর আঘাত আসে এমন বিষয়কে বর্তমানে আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বর্তমানে গণতান্ত্রিক রাটিসমূহে সরকার নির্বাচিত হয় নাগরিকদের দ্বারা এবং নাগরিকরা এটি কামনা করে যে, সরকার উত্তম প্রশাসনের দ্বারা স্বচ্ছতার সাথে সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। নাগরিকদের এ অনুভূতির ফল হলো আইনের শাসন এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। আর এ বিষয়গুলোই হলো সুশাসনের মূল বক্তব্য।

অর্থাৎ এ আলোচনা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে সুশাসন প্রত্যয়টি হঠাৎ বা দৈৰভাবে সৃষ্ট কোনো বিষয় নয়, এটি ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। তবে বর্তমানের সুশাসন তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সাল এ সময়ের মধ্যে আফ্রিকা অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাপক হারে কমে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যে বিশ্বব্যাংক ১৯৯১ সালে 'Sub Saharan Africa From Crisis to Sustainable Development' নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এ প্রতিবেদনের মূল বিষয় ছিল শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নীতি প্রণয়ন করে উন্নয়নের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্র গঠন বা State-building করতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন সুশাসন বা Good Governance।' সুশাসনের ধারণার জন্য বিশ্বব্যাংক ছয়টি সূচক চিহ্নিত করে এবং বিশ্বের সব দেশে এসব উপাদানের পরিমাপ করে তার ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা করে। ছয়টি সূচক হলো-

  1. বক্তব্য প্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা (Voice and accountability),
  2. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতার অনুপস্থিতি (Political stability and absence of violence),
  3. সরকারের কার্যকারিতা (Government effectiveness),
  4. নিয়ন্ত্রণের মান (Regulatory quality),
  5. আইনের শাসন (Rule of law) এবং
  6. দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ (Control of corruption)।

এই সূচকগুলো ধনায়ক ২ দশমিক ৫ থেকে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৫-এর স্কেলে মাপা হয়। কোনো দেশের সূচকের পরিমাণ শূন্যের কাছাকাছি হলে ধরে নিতে হবে যে এ সূচক অনুসারে দেশটির সুশাসনের মোট অবস্থান গড় অবস্থানের কাছাকাছি। সূচক শূন্য হতে ধনাত্মক ২ দশমিক ৫ এর মধ্যে যত উর্ধ্বে হবে, তত এই সূচক অনুসারে সে দেশের সুশাসনের তুলনামূলক অবস্থান উঁচুমানের ধরা হবে।

১৯৯২ সালে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটিকে গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে তারা উন্নয়নে শরিকানা, গণতন্ত্রের ও বহুদলীয় সমাজের পরিশোষণ, স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক, সুষ্ঠু ও কার্যকর জাতীয় সরকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, স্বাধীন যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদ বিকিরণ, দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতা এবং অত্যধিক সামরিক ব্যয়ের। সংকোচনের সুপারিশ করে।

পৃথিবীর যে কোনো দেশের সরকার সব সময়ই প্রত্যাশা করে যে, তাদের দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হোক। সেই শাসনব্যবস্থাকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায় সে ব্যাপারে সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে চিন্তারও পরিবর্তন ঘটেছে। উন্নত শাসন সংক্রান্ত চিন্তার বিবর্তনের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বর্তমানের সুশাসন সংক্রান্ত ধারণা। অর্থাৎ এক কথায় বলা যায় বর্তমানের সুশাসন ধারণাটি সময়ের বিবর্তনে গড়ে ওঠা একটি বিষয়।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। সুশাসনের ক্রমবিকাশ - Evolution of Good Governance এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url