বাংলাদেশের ভূ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর

আচ্ছালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক - দৈনিক শিক্ষা ব্লগর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমি আপনাদের মাঝে বাংলাদেশের ভূ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর নিয়ে আলোচনা করব।

বাংলাদেশের ভূ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা কর, বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য (Physiogaphic Characteristics of Bangladesh), পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষে। তাই ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ হলো বঙ্গখাতের এক বৃহত্তম অংশ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ। এদেশের শতকরা ২০ ভাগ পাহাড়ি এলাকা ছাড়া বাকি ৮০ ভাগই পলল দ্বারা গঠিত সমভূমি।

এ সমভূমির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে অসংখ্য নদ-নদী। এছাড়াও রয়েছে বহু খাল-বিল-হাওর-বাঁওড়, বনাঞ্চল ইত্যাদি। বড় বড় নদীগুলোর মধ্যে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলী প্রভৃতি প্রধান। এদেশের ভূতাত্ত্বিক বিশেষত্ব হচ্ছে পূর্বে নাগা, লুসাই ও আরাকান ভঙ্গিল পর্বতমালা, পশ্চিমে ভারতের উপদ্বীপীয় অঞ্চল ভূখণ্ড ও রাজমহল মালভূমি, উত্তরে শিলং মালভূমি ও হিমালয় পর্বতমালা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত।

বাংলাদেশের ভূখণ্ড উত্তর হতে দক্ষিণ দিকে ক্রমশ ঢালু হয়ে অবস্থিত। ফলে এদেশের অধিকাংশ নদী, উপনদী ও শাখানদীগুলো উত্তর দিক হতে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের অভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়িয়া অঞ্চল ব্যতীত প্রায় সমগ্র দেশটিই যেন দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদ- নদীর পলল দ্বারা গঠিত।

বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক শ্রেণিবিভাগ

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিকে শ্রেণিবিভাগের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভূগোলবিদ বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নানা ধরনের জরিপ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নানাপ্রকার শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। যেমন-
  • ১৯৫৪ সালে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিন্যাস করেন স্টেপ।
  • ১৯৫৭ সালে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে এর শ্রেণিবিন্যাস করেন জনসন।
  • ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিন্যাস করেন মর্গান ম্যাকেন টায়ার।
  • ১৯৫৫ সালে শ্রেণিবিন্যাস করেন আহমদ।
  • ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিন্যাস করেন হারুন।
  • ১৯৮১ সালে ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিন্যাস করেন মনিরুজ্জামান মিঞা।

বাংলাদেশের ভূ প্রকৃতির তিনটি বৈশিষ্ট্য

সব শ্রেণিবিন্যাসের আলোকে বাংলাদেশের অবস্থান, ভূমির গঠন, ভূমির অবস্থা ও ভূতাত্ত্বিক সময়কাল অনুসারে এ দেশের ভূপ্রকৃতিকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা- (১) টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ, (২) প্লাইস্টোসিনকালের সোপানসমূহ এবং (৩) সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি। নিচে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী আলোচনা করা হলো:

১। টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ: ৭০ মিলিয়ন বছর আগে টারশিয়ারি যুগে হিমালয় পর্বত উত্থিত হওয়ার সময় এ পাহাড়গুলো গঠিত হয়েছে বলে একে টারশিয়ারি যুগের পাহাড় বলা হয়। এ পাহাড়গুলো বেলে পাথর, স্লেট জাতীয় প্রস্তর এবং কর্দম দ্বারা গঠিত। এ পাহাড়গুলোকে আসামের লুসাই এবং মিয়ানমারের আরাকান পাহাড়ের সমগোত্রীয় বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে অবস্থিত টারশিয়ারি যুগের পাহাড়গুলোকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

(ক) দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান জেলা এবং চট্টগ্রাম জেলার অংশবিশেষে অবস্থিত পাহাড়সমূহ নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এ পাহাড়গুলো পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত। এ অঞ্চলের পাহাড়গুলোর গড় উচ্চতা ৬১০ মিটার।

পাহাড়গুলোর উচ্চতা পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে ক্রমশ বেড়েছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ তাজিনডং যার বর্তমান নাম বিজয় এ অঞ্চলের বান্দরবান জেলায় অবস্থিত। এর উচ্চতা ১.২৩১ মিটার। আবার এ অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বপ্রান্তে বান্দরবান জেলার কিওক্রাডং পর্বত অবস্থিত যার উচ্চতা ১,২৩০ মিটার।

এ অঞ্চলে পাহাড়ের মাঝে মাঝে বহু সংকীর্ণ উপত্যকা দেখা যায়। এ উপত্যকা দিয়ে কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, হালদা, কাসালং, নাফ প্রভৃতি নদী প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এ নদীগুলো বেশ খরস্রোতা। তাই কর্ণফুলী নদীর উজানে কাপ্তাইয়ে বাঁধ দিয়ে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।

এ অঞ্চলে আবার বাঁশ, গজারি, শাল, সেগুন প্রভৃতি বৃক্ষ দেখা যায় প্রচুর পরিমাণে। এ অঞ্চলে রাবার, চা, আনারস, কমলালেবু ইত্যদি ভালো হয়ে থাকে। তাছাড়াও এ পার্বত্য এলাকা কৃষিকাজের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হওয়াতে স্থানীয় অধিবাসিগণ জুম পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে। জুম চাষ হলো জঙ্গল কেটে চাষাবাদ করা।

একই স্থানে কয়েক বছর চাষাবাদ করার পর উক্ত জমি ত্যাগ করে আবারও অন্য জমি বেছে নেওয়া হয়। এ পাহাড়ি এলাকার কোনো কোনো স্থানে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, চুনাপাথর প্রভৃতি রয়েছে। যেমন, লামা ও বান্দরবান এলাকাতে লিগনাইট কয়লা ও চুনাপাথর এবং সেমুতাং এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। এ পাহাড়ি এলাকার বাঁশের ওপর ভিত্তি করে কর্ণফুলী কাগজকল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যে কাগজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।

(খ) উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ: দেশের-উত্তর পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে অবস্থিত ছোট-বড় পাহাড়গুলোকে নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এ পার্বত্য ভূমির উচ্চতা সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ মিটারের বেশি নয়। তবে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাংশের পাহাড়গুলোর উচ্চতা ২৪৪ মিটার।

সিলেট জেলার পাহাড়িয়া অঞ্চল সিলেট শহরের উত্তর-পূর্ব দিকে ১৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এ অঞ্চলের উত্তরের পাহাড়গুলো স্থানীয়ভাবে টিলা নামে পরিচিত। এগুলোর উচ্চতা ৩০.. থেকে ৯০ মিটারের মধ্যে। এ অঞ্চলে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক শহরের উত্তরে প্রায় ৪০ বর্গকিলোমিটার স্থান নিয়ে একটি টিলা পাহাড় রয়েছে।

এটিকে বলা হয় ছাতক পাহাড়। টিলা জাতীয় পাহাড়গুলো মূলত খাসিয়া, জয়ন্তিয়া, গারো ও লুসাই পাহাড়ের বিচ্ছিন্ন, অংশবিশেষ। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সীমানায় অবস্থিত পাহাড়গুলো কোনো ধরনের গিরিশ্রেণি গঠন করেনি। এ পাহাড়ের ঢালগুলো খাড়া এবং উপরিভাগ অসমান।

আবার শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার উত্তর সীমানায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিচ্ছিন্ন অংশ দেখা যায়। এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। এখানকার পাহাড়ের ঢালে প্রচুর পরিমাণে চা উৎপন্ন হয়। তাছাড়াও এখানে বাঁশ ও বেত পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল, চুনাপাথর, কয়লা প্রভৃতি খনিজ সম্পদে এ অঞ্চল বেশ সমৃদ্ধশালী। এ অঞ্চলের কোনো কোনো অঞ্চলে আনারসের চাষ হয়ে থাকে।

২। প্লাইস্টোসিনকালের সোপানসমূহ: ভূতাত্ত্বিক সময়পঞ্জি অনুযায়ী আনুমানিক ২৫,০০০ বছর পূর্বে এ সোপান অঞ্চল গঠিত হয়েছে বলে ভূবিজ্ঞানীরা মনে করেন। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশের সুবিশাল বরেন্দ্রভূমি, মধ্যভাগের মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় এবং কুমিল্লা জেলার লালমাই উচ্চভূমি নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত।

প্লাইস্টোসিন যুগের অন্তঃবরফ গলে প্লাবনের সৃষ্টি হয়েছিল এবং সে প্লাবনের ফলে এসব উচ্চভূমি গঠিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এ অঞ্চলের মোট আয়তন ১৩,৪৬৬ বর্গকিলোমিটার। মাটির রং লাল ও ধূসর। প্লাইস্টোসিনকালের সোপান এলাকাকে আলোচনার সুবিধার্থে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- (ক) বরেন্দ্রভূমি, (খ) মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় ও (গ) লালমাই পাহাড়। নিচে প্লাইস্টোসিনকালের সোপান এলাকাগুলো আলোচনা করা হলো:

(ক) বরেন্দ্রভূমি: বাংলাদেশের দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও রংপুর অঞ্চল নিয়ে এ বরেন্দ্রভূমি অঞ্চল গঠিত। এ অঞ্চলের আয়তন ৯,২৮৮ বর্গকিলোমিটার বা ৩,৬০০ বর্গমাইল। বরেন্দ্রভূমি প্লাবন সমভূমি থেকে প্রায় ৬ থেকে ১২ মিটার উঁচু হয়ে থাকে। এ অঞ্চলটি প্লাইস্টোসিন যুগের উচ্চভূমি। সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলটি পুনর্ভবা, আত্রাই ও যমুনা নদী দ্বারা চারটি অংশে বিভক্ত।

এ অঞ্চলের মাটির রং অনেকটা হলুদ থেকে লালচে হলুদ। এ অঞ্চলে গভীর খাতবিশিষ্ট আঁকাবাঁকা ছোট ছোট কয়েকটি স্রোতস্বিনী রয়েছে। এগুলো খাড়ি নামে পরিচিত। বরেন্দ্র অঞ্চলটি কৃষিতে বিশেষভাবে উপযোগী। কৃষিজ ফসলের মধ্যে ধানই প্রধান। ধান ছাড়াও পাট, ভুট্টা, পান প্রভৃতি কিছু কিছু উৎপন্ন হয়ে থাকে এ অঞ্চলে।

বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক শ্রেণিবিভাগ

(খ) মধুপুর ও ভাওয়ালের গড়: বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকা জেলা নিয়ে মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় অবস্থিত। এ অঞ্চলের মোট আয়তন ৪,১৩৩ বর্গকিলোমিটার। এটি প্লাইস্টোসিনকালে গঠিত দ্বিতীয় বৃহত্তম উঁচুভূমি। টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে অবস্থিত এ অঞ্চলের উত্তরাংশকে বলা হয় মধুপুর গড় এবং গাজীপুর জেলার মধ্যে অবস্থিত এ অঞ্চলের দক্ষিণাংশকে বলা হয় ভাওয়ালের গড়।

এ গড়ের পূর্ব ও দক্ষিণাংশের উচ্চতা ৬ মিটার (২০ ফুট) কিন্তু পশ্চিম ও উত্তর দিকের উচ্চতা ৩০ মিটার (১০০ ফুট)। এ এলাকার মাটির রং সাধারণত লাল ও কঙ্করময়। মধুপুর গড়কে আবার 'নদী সোপান' বা উত্থিত ব- দ্বীপও বলা হয়। এ এলাকার মধ্য দিয়ে বংশী, লক্ষ্যা, স্থানার বালু, মহারী, সুতিয়া, তুরাগ, লৌহজং প্রভৃতি নদী প্রবাহিত হয়েছে। এ অঞ্চল কৃষিকাজের জন্য বিশেষ উপযোগী নয়। তবে মধুপুর এলাকায় আনারস ও নানা ধরনের সবজি চাষ হয়। মধুপুর অঞ্চল শালবনে আবৃত।

(গ) লালমাই পাহাড়: লালমাই পাহাড় বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলা শহর থেকে ৮ কি.মি. পশ্চিমে অবস্থিত। এ এলাকার আয়তন ৩৪ বর্গকিলোমিটার (১৩ বর্গমাইল)। গড় উচ্চতা ২১ মিটার তবে কোনো কোনো স্থানে ৪৫ মিটার পর্যন্ত লক্ষ করা যায়। লালমাই পাহাড় এলাকা কোনো পর্বতশ্রেণির অংশ নয়। এটি চ্যুতির মধ্যবর্তী অংশ হস্ট (Horst) শ্রেণিভুক্ত। এ অঞ্চলের মাটির রং লাল। পাহাড়গুলো লালমাটি, নুড়ি, বালি ইত্যাদি দ্বারা গঠিত। এ এলাকাতে কাঁঠাল, আলু, তরমুজ, ফুটি, মিষ্টি আলু প্রভৃতি চাষ হয়।

৩। সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি: টারশিয়ারি যুগের পাহাড়ি এলাকা এবং প্লাইস্টোসিনকালের সোপানসমূহ বাদে সমগ্র বাংলাদেশ সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমির অন্তর্ভুক্ত। সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি অঞ্চলটি পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা প্রভৃতি নদ-নদী ও এদের উপনদী শাখানদী বাহিত পলিমাটি দ্বারা গঠিত।

এ অঞ্চলের মোট আয়তন ১,২৪,২৬৬ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের বৃহত্তম এ এলাকার নদীগুলো প্রায়ই গতি পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন পললভূমি গঠিত হতে দেখা যায়। এ সমভূমির গড় উচ্চতা ৯ মিটার (৩০ ফুট) যে কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্লাবন সমভূমি এলাকাতে পানি ওঠে যায়। প্লাবন সমভূমি পলি দ্বারা গঠিত বলে এ অঞ্চলের মাটি উর্বরতা তুলনামূলকভাবে অন্য এলাকার চেয়ে অনেক বেশি।

এ এলাকাতে বিচ্ছিন্নভাবে বিল-ঝিল, হাওর-বাঁওড় ছড়িয়ে রয়েছে, যা দেশের ভূপ্রকৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানকার জলাভূমিতে বর্ষাকালে পানি থাকে কিন্তু শীত ও গ্রীষ্মের শুরুতে শুকিয়ে যায়। এখানে বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ হয় এবং মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধশালী। বিল-ঝিলের পাশাপাশি মেঘনার মোহনায় হাতিয়া, সন্দ্বীপ, শাহবাজপুর এবং ভোলা প্রভৃতি দ্বীপ অবস্থিত।

তাছাড়া দেশের দক্ষিণ উপকূলে অনেক ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। সেসব দ্বীপ বেশ উর্বর এবং বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ করে শীতকালে মানুষ মৎস্যসম্পদ আহরণসহ নানা ধরনের সম্পদ আহরণে কিছুদিন অবস্থান করে। দেশের সমগ্র সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি অঞ্চলটি একই ধরনের নয় বলে একে আবার নিম্নলিখিত কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে আলোচনা করা যায়।

ক) কুমিল্লার বা ত্রিপুরার সমভূমি: কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অধিকাংশ, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও হবিগঞ্জ জেলার কিছু অংশ নিয়ে এ সমভূমি অঞ্চল গঠিত। এ সমভূমি অঞ্চলের আয়তন ৭,৪৩৩ বর্গকিলোমিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড় উচ্চতা ৬ মিটার। বর্ষার সময় এ এলাকা প্লাবিত হয়। এ অঞ্চলে বেশকিছু নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদীগুলো হলো- সালদা, বুড়ি, গোমতি, ডাকাতিয়া প্রভৃতি। এ অঞ্চলে মাটি খুব উর্বর ফলে এ অঞ্চলে ধান, পাট, আলু প্রভৃতি অধিক পরিমাণে জন্মে।

(খ) পাদদেশীয় পলল সমভূমি: দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ স্থান জুড়ে এ পাদদেশীয় পলল সমভূমি অঞ্চল বিস্তৃত। এর সমভূমির উচ্চতা ৩০.৫ মিটার। সর্বোচ্চ উচ্চতা ৯৩.৫ মিটার। পাদদেশীয় পলল সমভূমির মোট আয়তন ৪০০০ বর্গ কি.মি.। তিস্তা, আত্রাই, করতোয়া প্রভৃতি নদীবাহিত পলি জমা হয়ে এ পাদদেশীয় পলল সমভূমি অঞ্চলে ঢালু ভূমির সৃষ্টি হয়েছে। এ অঞ্চলও কৃষিকাজের জন্য বেশ সমৃদ্ধশালী। ধান, পাট, ইক্ষু, তামাক প্রভৃতি এ অঞ্চলে চাষ হয়ে থাকে।

(গ) সিলেট অববাহিকা: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার অধিকাংশ এবং কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার পূর্বদিকের সামান্য কিছু অংশ নিয়ে সিলেট অববাহিকা অঞ্চল গঠিত। এ এলাকার দক্ষিণাঞ্চলে কতকগুলো হ্রদ রয়েছে। এগুলোকে হাওর বলা হয়।

সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এ অববাহিকার উচ্চতা প্রায় ৩ মিটার (১০ ফুট)। বর্ষার সময় এ এলাকাটি পানিতে প্লাবিত হয়। শীতকালে পানি নেমে যায় এবং সে সময় এ অঞ্চলে বোরো ও ইরি ধানের চাষ হয়। এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য হাওরগুলোর মধ্যে ফেঞ্চুগঞ্জের পূর্বে হাকালুকি। এটি দেশের বৃহত্তম হাওর। তাছাড়া ছাতকের দক্ষিণ-পশ্চিমে দেখার, জগন্নাথপুরের উত্তর-পূর্বে নলোওয়ার, শ্রীমঙ্গলের উত্তরে হাইল প্রভৃতি বিশেষ প্রসিদ্ধ।

(ঘ) গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার প্লাবন সমভূমি: বৃহত্তর ঢাকা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে এ প্লাবন সমভূমি এলাকা গঠিত। এ অঞ্চলে বেশকিছু বিল ও হাওর আছে। বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল চলন বিল এ প্লাবন সমভূমি এলাকাতে অবস্থিত। এ অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানই বর্ষার সময় পানিতে প্লাবিত হয়। এ প্লাবন সমভূমি এলাকার মাটি উর্বর বলে এখানে ধান, পাট, গোল আলু, গম, তামাক, বিভিন্ন প্রকার ডাল, তৈলবীজ প্রভৃতি ফসলের চাষ হয়ে থাকে।

(ঙ) ব-দ্বীপ: বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের সমভূমিকে ব-দ্বীপ বলা হয়। এ ব-দ্বীপ অঞ্চলটি বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালীর সমস্ত অংশ এবং রাজশাহী, পাবনা, ঢাকা অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। এ ব-দ্বীপ অঞ্চলকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

(i) সক্রিয় ব-দ্বীপ: মেঘনা হতে পশ্চিমে গড়াই-মধুমতি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত সমভূমির পূর্বাংশকে সক্রিয় ব-দ্বীপ অঞ্চল বলে।

(i) মৃত প্রায় ব-দ্বীপ: গড়াই-মধুমতি নদীর পশ্চিমাংশকে মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ বলা হয়। এটি বৃহত্তর যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের অধিকাংশ স্থান জুড়ে বিস্তৃত।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার প্লাবন সমভূমি

(iii) স্রোতজ সমভূমি: বাংলাদেশের ব-দ্বীপ অঞ্চলের দক্ষিণাংশ জোয়ার-ভাটা দ্বারা প্রভাবিত বলে এ অঞ্চলকে স্রোতজ সমভূমি বলে।

(চ) চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী সমভূমি: এ সমভূমি অঞ্চলটি ফেনী নদী হতে কক্সবাজারের কিছু দক্ষিণ অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সমভূমি এলাকাটি গড়ে প্রায় ৯.৬ কিলোমিটার প্রশস্ত। এ অঞ্চলটি কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, বাঁশখালী প্রভৃতি নদীবাহিত পলল দ্বারা গঠিত।

এ এলাকার পতেঙ্গা ও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশ্ববিখ্যাত। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দৈর্ঘ্য ১৫৫ কি.মি.। এ সমভূমি এলাকাটির ভূপ্রকৃতি অর্থনৈতিক উন্নয়নে অপরিসীম প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন প্রভৃতির ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

আপনার আসলেই দৈনিক শিক্ষা ব্লগর একজন মূল্যবান পাঠক। বাংলাদেশের ভূ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর এর আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ। এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url